নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গত প্রায় তিন মাসে বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৬২৮ জনের। এর মধ্যে বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ২৬ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ নারী, ৪০ শতাংশ পুরুষ এবং ৫ শতাংশ শিশু। বয়সের হিসাবে আক্রান্তদের ৫ শতাংশের বয়স ১ থেকে ১০ বছর, ১৫ শতাংশ ১০ থেকে ২০ বছর, ৫০ শতাংশ ২০ থেকে ৪০ বছর এবং ৩০ শতাংশের বয়স ৪০ থেকে ৬৫ বছর।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, গত তিন মাসের মধ্যে আগস্ট মাসেই ডেঙ্গু রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি ছিল। এ সময়ে ৪২ বছর বয়সী এক নারী ডেঙ্গুতে মারা যান।
বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এর মধ্যে গড়ে ১৫ থেকে ১৭ জনের পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসছে। অর্থাৎ পরীক্ষায় আসা রোগীদের একটি বড় অংশই ডেঙ্গু আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হচ্ছেন।
তবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই পরিসংখ্যানই বন্দরের প্রকৃত ডেঙ্গু আক্রান্তের পূর্ণ চিত্র নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ অনেক রোগী বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার বন্দর থেকে ভিক্টোরিয়া ও খানপুর হাসপাতালে রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। মদনপুর ও উত্তরাঞ্চলের অনেকে স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাবে না আসা রোগীর সংখ্যাও কম নয়।
বন্দর উপজেলার ৯টি ওয়ার্ড ও ৫টি ইউনিয়নের মধ্যে সিটি করপোরেশনের ২০, ২১, ২৪ ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ড এবং বন্দর ইউনিয়নে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলে জানা গেছে।
ডেঙ্গু রোগীর চাপের চিত্র পাওয়া গেছে বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ৪ থেকে ৫টি সিটে একই সঙ্গে দুইজন রোগী রাখার নজিরও মিলেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চৌরাপাড়া এলাকার ৪২ বছর বয়সী তামান্না জানান, তিনি দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। নিয়মিত চিকিৎসা ও স্যালাইন পেলেও বেশিরভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে এবং কিছু পরীক্ষা বাইরের প্রতিষ্ঠান থেকে করাতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মুছাপুর ইউনিয়নের রোগী রাইহান জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর তার সারা শরীরে ব্যথা, খাবারে অরুচি ও বমি হচ্ছে। তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন তিনি। তবে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে জানান এই রোগী।
সোনাকান্দা এলাকার ৫৫ বছর বয়সী মিতু বেগম জানান, দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন তিনি। ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে সারা শরীরে তীব্র ব্যথা অনুভব করছেন।
এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও নিয়মিত কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কর্মকর্তারা। ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব সানি সরকার ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব রমিজ উদ্দিন কাজল জানান, নিয়মিত ক্যাম্পেইন, লিফলেট বিতরণ এবং সকাল-বিকেলে স্প্রে ও ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু মশক নিধন কার্যক্রম চালালেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাড়ির ভেতর ও আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণসামগ্রীসহ যেসব স্থানে পানি জমতে পারে সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি।
বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. আলাউল কবির দিপু ডেঙ্গু পরিস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মানুষের অসচেতনতা এবং নিজেদের ঘরবাড়ি পরিষ্কার না রাখার কারণেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। তাই মশা নিধনের পাশাপাশি প্রত্যেককে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও স্যালাইন মজুতও শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র জানতে শুধু হাসপাতালের ভর্তি রোগীর সংখ্যা দেখলে হবে না; বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া এবং অন্যান্য হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের হিসাবও বিবেচনায় নিতে হবে। আর এ কারণে বন্দরে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পড়ুন : ডিবি ওসিকে প্রত্যাহারে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম পাবনায় রাজপথে সাংবাদিকরা


