সাধারণ মানুষের কাছে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা আরও আকর্ষণীয় ও কার্যকর করতে একগুচ্ছ নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন সুবিধা দেওয়া, পেনশনারদের স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনা, বিশেষ পরিস্থিতিতে স্কিম থেকে বের হওয়ার সুযোগ এবং গ্রাহকদের জন্য ঋণ সুবিধা চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া সর্বজনীন পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আগ্রহী গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে শরিয়াহভিত্তিক সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর বিষয়েও আলোচনা হবে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। অর্থমন্ত্রী পদাধিকারবলে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদ অনুমোদন দিলে এবং বিদ্যমান বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন করা সম্ভব হলে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এসব সুবিধা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হতে পারে।
দেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে ২০২৩ সালের আগস্টে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করে সরকার। এর লক্ষ্য ছিল দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা এবং অবসর-পরবর্তী সময়ে মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তবে চালুর প্রায় তিন বছর পার হলেও সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকের আমানতের তুলনায় পেনশন স্কিমের রিটার্ন নিয়ে মানুষের আগ্রহ কম এবং গ্রাহকদের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সুবিধার সুযোগও সীমিত। এসব কারণে অনেক সম্ভাব্য গ্রাহক এখনো এই ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখাননি।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চারটি স্কিম মিলিয়ে এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন। এসব গ্রাহকের জমা করা মোট অর্থের পরিমাণ ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
এর মধ্যে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য চালু করা সমতা স্কিমে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিবন্ধিত হয়েছেন। এ স্কিমে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন গ্রাহক রয়েছেন। তাঁদের জমা করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
অন্যদিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রবাস স্কিম চালু করা হলেও এতে তুলনামূলকভাবে সাড়া কম। এ পর্যন্ত এই স্কিমে মাত্র ১ হাজার ১৭১ জন প্রবাসী নিবন্ধিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নারী মাত্র ৯৭ জন। এই স্কিমে মোট জমার পরিমাণ প্রায় ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
নতুন সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার ব্যবস্থা করা। বর্তমানে কোনো পেনশনার ৬০ বছর বয়সে পেনশন পাওয়া শুরু করার পর মারা গেলে তাঁর নমিনি পেনশনারের ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত নির্ধারিত হারে মাসিক পেনশন পেয়ে থাকেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী নির্দিষ্ট শর্তে আজীবন পেনশন পাওয়ার সুযোগ পান। সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বজনীন পেনশনেও পেনশনারের স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
এ ছাড়া গ্রাহকদের জন্য ঋণ সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। সর্বজনীন পেনশন আইনে বিশেষ প্রয়োজনে গ্রাহকের জমা অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে নেওয়ার সুযোগ রাখার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এ সুবিধা কার্যকর হয়নি। নতুন উদ্যোগের আওতায় ঋণ সুবিধা চালু করা হতে পারে। এই ঋণের সুদও সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের পেনশন হিসাবে জমা হওয়ার কথা রয়েছে।
স্কিম থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো গ্রাহক কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা দেওয়ার আগে মারা গেলে তাঁর জমা অর্থ মুনাফাসহ নমিনিকে ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে জীবিত অবস্থায় গ্রাহকের জন্য সাধারণভাবে স্কিম থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অন্তত পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতার কারণে আর চাঁদা দিতে না পারলে বিশেষ বিবেচনায় স্কিম থেকে বের হয়ে পুরো অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পেতে পারেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্ষদ সভার অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় বিধিমালা সংশোধনের ওপর নির্ভর করবে।
পেনশনভোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেও বিমা সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য একটি স্বাস্থ্যবিমা পরিকল্পনার খসড়া ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পেনশন গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত নামমাত্র প্রিমিয়াম নেওয়া হতে পারে।
ধর্মীয় বিবেচনায় যারা প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থায় আগ্রহী নন, তাদের জন্য শরিয়াহভিত্তিক একটি সংস্করণ চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে সরকার। এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে ইসলামি শরিয়াহ অনুসরণকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আরও কিছু শ্রেণি-পেশার মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংক খাতের কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন সুবিধাগুলো চালু হলে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জরুরি সময়ে গ্রাহকদের কিছুটা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে।
পর্ষদ সভায় প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। এরপর পর্যায়ক্রমে নতুন সুবিধাগুলো চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত অংশগ্রহণ না থাকায় নতুন সংস্কারগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে আজীবন স্বামী-স্ত্রী পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা, ঋণ সুবিধা ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্কিম থেকে বের হওয়ার সুযোগ চালু হলে গ্রাহকদের কাছে ব্যবস্থাটি আগের তুলনায় বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন কাঠামো, সুবিধার শর্ত এবং গ্রাহকদের আস্থার ওপর।
পড়ুন:২০৩০ সালের মধ্যে ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ পিডিবির
ইমি/


