তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে নিজেই উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিরল এই অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফর। দুই নেতার বৈঠকে বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ইরান ইস্যুতে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের বাইরে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে শি জিনপিংকে স্বাগত জানান ট্রাম্প। রানওয়েতে ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প শি জিনপিং ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানের সঙ্গে করমর্দন করেন।
এ সময় সামরিক বাহিনীর একটি দল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের পাশে ছিল ছয়টি এফ-২২ ও ছয়টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। পাশাপাশি দুটি বি-১ বোমারু বিমানও আকাশে উড়ে যায়।
বিমানবন্দরে ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা ছিল বিরল প্রটোকল। কয়েক দশক আগে পোপ ছাড়া অন্য কোনো বিদেশি নেতাকে এভাবে স্বাগত জানানোর নজির খুবই কম। এক দশকেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে শি জিনপিংয়ের এটিই প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুই দেশের নেতাদের বৈঠক এবং রোজ গার্ডেনে সামরিক কুচকাওয়াজ আয়োজনের কথা রয়েছে। এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন ও বেইজিং বাণিজ্যযুদ্ধের বিরতির মেয়াদ আরও বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
আগের চুক্তি অনুযায়ী বাণিজ্যযুদ্ধের বিরতি ১০ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা ছিল। এখন তা বাড়িয়ে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছে। স্কট বেসেন্ট ও চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেংয়ের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়েও প্রাথমিক যোগাযোগের কাঠামো তৈরির বিষয়টি উঠে আসে।
বৃহস্পতিবার দুই নেতা বৈঠকে বসলে বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। প্রযুক্তির দ্রুত ও নিয়ন্ত্রণহীন অগ্রগতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের মধ্যেই এসব বিষয়ে আলোচনা হবে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, শীর্ষ বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ‘বিভিন্ন ধরনের অনেক চুক্তির’ বিষয় রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্কের হার সর্বোচ্চ ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল, পরে তা কমানো হয়।
এক লিখিত বক্তব্যে চীনা জনগণের পক্ষ থেকে মার্কিন জনগণের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।
সি চিন পিং বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই মহান দেশ এবং দুই দেশের জনগণই মহান। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রয়েছে এবং দুই দেশের স্বার্থ গভীরভাবে জড়িত। দুই দেশের অংশীদার হওয়া উচিত, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। চীনা জাতির মহান পুরুদ্ধার এবং ‘আমেরিকাকে আবার মহান করা’—এই দুই লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়; বরং এগুলো পাশাপাশি এগিয়ে যেতে পারে, একে অপরকে এগিয়ে নিতে পারে এবং বিশ্বকে উপকৃত করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চলতি বছরের মে মাসে চীন সফর করার সময় আমরা চীন-যুক্তরাষ্ট্রের গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছিলাম, যা ভবিষ্যতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
সি চিন পিং বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং এমন একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে সহযোগিতা হবে প্রধান ভিত্তি, প্রতিযোগিতা থাকবে সংযত, মতপার্থক্য থাকবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং শান্তির সম্ভাবনা থাকবে সুস্পষ্ট। এভাবেই নতুন যুগে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুই বৃহৎ দেশের সঠিকভাবে সহাবস্থানের পথ তৈরি করা সম্ভব।
সি চিন পিং জোর দিয়ে বলেন, বিশ্ব এগিয়ে চলছে, সময়ও পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহাসিক যুক্তি বদলায়নি; দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি; আর চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক প্রত্যাশাও বদলায়নি।
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এবং বিশ্বের পরিস্থিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে গভীরভাবে মতবিনিময় করার প্রত্যাশা করছি। একই সঙ্গে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্কের বিষয়বস্তু আরও সমৃদ্ধ করা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের যোগাযোগ ও সহযোগিতার পরিসর আরও বিস্তৃত করার প্রত্যাশা করছি।
সি চিন পিং আরও বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মহলের মানুষের সঙ্গে ব্যাপক যোগাযোগ করতে এবং বন্ধুত্ব আরও গভীর করতে আগ্রহী। দুই পক্ষের যৌথ প্রচেষ্টায় এই সফর অবশ্যই ফলপ্রসূ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের কল্যাণ বৃদ্ধি পাবে এবং বিশ্ব শান্তিতে নতুন আশার সঞ্চার হবে।
এদিকে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রযুক্তি খাতের কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন টিম কুক, ইলন মাস্ক, জেনসেন হুয়াং ও স্যাম অল্টম্যান।
শি জিনপিংয়ের রাষ্ট্রীয় সফর শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ন্যাশনাল আর্কাইভসে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের যৌথ সফরের মধ্য দিয়ে শেষ হবে।
পড়ুন : বিভিন্ন দেশে ‘বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ’ কেনার হিড়িক, সাথে বাংলাদেশও
সা/


