যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূলে আঘাত হেনেছে ২০২৬ সালের আটলান্টিক ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের প্রথম ঘূর্ণিঝড় ‘ইসাইয়াস’। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে ডেস্টিনের কাছে উপকূলে আছড়ে পড়ে ঝড়টি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্র জানিয়েছে, আঘাত হানার সময় ঘূর্ণিঝড়টির শ্রেণি ছিল দ্বিতীয় এবং বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০৫ মাইল।
ঘূর্ণিঝড়টি মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় মিসিসিপি নদীর মোহনা থেকে ফ্লোরিডার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত প্রাণঘাতী জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা দেখা দেয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংসাত্মক বাতাস ও তীব্র ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দিনের শুরুতে ইসাইয়াস তৃতীয় শ্রেণির ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছিল। তবে উপকূলে পৌঁছানোর আগেই এর শক্তি কমে দ্বিতীয় শ্রেণিতে নেমে আসে। তারপরও জলোচ্ছ্বাস, বিপজ্জনক আবহাওয়া ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা কাটেনি।
ঝড়ের প্রভাব শুক্রবার সকাল থেকেই উপকূলীয় এলাকায় অনুভূত হতে শুরু করে। জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক শহরগুলোতে নেমে আসে অস্বাভাবিক নীরবতা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্লোরিডা, আলাবামা ও জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, শনিবার (১০ অক্টোবর) রাতের মধ্যে ইসাইয়াস আরও দুর্বল হয়ে ক্রান্তীয় বৈশিষ্ট্য হারানো ঝড়ে পরিণত হতে পারে। তবে এর প্রভাবে ফ্লোরিডার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে ৯ ফুট পর্যন্ত এবং আলাবামার উপকূলীয় এলাকায় ৬ ফুট পর্যন্ত জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে।
এ বছরের নাম পাওয়া নবম ঝড় ইসাইয়াস। তবে চলতি মৌসুমে এটিই প্রথম ঘূর্ণিঝড় এবং বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়া প্রথম ঝড়। তৃতীয় বা তার চেয়ে উচ্চ শ্রেণির ঘূর্ণিঝড়কে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে চলতি বছরের আটলান্টিক ঘূর্ণিঝড় মৌসুমকে ঐতিহাসিকভাবে শান্ত বলে বিবেচনা করা হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ইসাইয়াসের শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়া উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
চিলিতে ভারী বৃষ্টিতে বন্যা, জরুরি অবস্থা ঘোষণা
এদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির রাজধানী সান্তিয়াগো ও আশপাশের এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। কাদামাটির স্রোতে গাড়ি ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি প্লাবিত হয়েছে ঘরবাড়ি ও সড়ক। প্রাণ বাঁচাতে অনেক বাসিন্দাকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানীর পূর্বাঞ্চলীয় উপশহর লাস কন্দেসে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ত। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভারী বৃষ্টিতে সান্তিয়াগোর বিভিন্ন সড়ক পানিতে ডুবে যায়। কিছু এলাকায় সড়ক দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি প্রবাহিত হতে দেখা যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি সেবায় নিয়োজিত সরকারি সংস্থাগুলোকে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
লাস কন্দেসের মেয়র কাতালিনা সান মার্টিন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওই এলাকায় ১৪ দশমিক ৪ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে সাধারণত যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, এবার তার প্রায় নয় গুণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
সান্তিয়াগোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মাপোচো নদীর পানি উপচে পড়ায় বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভূমিধসের আশঙ্কায় চিলির দুর্যোগ মোকাবিলা সংস্থা আরও ১০টি জেলায় উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। পাশাপাশি শুক্রবার (১০ অক্টোবর) স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের শুরুতে হওয়া বৃষ্টিতেও মধ্য চিলির কয়েক ডজন বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ছাড়া সান্তিয়াগোর প্রায় ১২ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তবে শুক্রবার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। আহতদের মধ্যে হাড় ভেঙে যাওয়া এক বছর বয়সী শিশুও রয়েছে। দমকলকর্মীরা এক হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করেছেন অথবা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন।
শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো
এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা এল নিনো আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্তকালে সাধারণত বৃষ্টিপাত বেড়ে যায়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) জানিয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে এল নিনো সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। এমনকি ১৯৫০ সালের পর এটি সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: এনবিসি নিউজ, এপি ও সিএনএন
পড়ুন : ২৫ লাখ বছরের গোপন গল্প বলেই যাচ্ছে রক্তের ঝরনা!
সা/


