ধ্রুব রাঠিকে আটক করল গুরুগ্রাম পুলিশ, দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা

দিল্লিতে প্রস্তাবিত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার আগে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করেছে ভারতের গুরুগ্রাম পুলিশ। পুলিশের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়েছে বলে হিন্দুস্তান টাইমসকে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লিতে নির্ধারিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আগে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর কেন্দ্রীয় বিহার আবাসন সমিতিতে ধ্রুব রাঠির বাসভবনে পৌঁছায় পুলিশের একাধিক দল।

গুরুগ্রাম পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এর আগে জানিয়েছিলেন, ধ্রুব রাঠিকে দিল্লিতে গিয়ে বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছিল। হিন্দুস্তান টাইমসকে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি যদি নির্দেশ অমান্য করেন এবং দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে তাকে আটক করা হবে।’

পুলিশের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগেই পরে ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয়।

এদিকে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লির জন্তর মন্তরে বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। এ কর্মসূচি ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীতে ২০ হাজারের বেশি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এরই মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে চার শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।

এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজীব চক, নয়াদিল্লি, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক ও কাশ্মীরি গেট স্টেশন।

এ ছাড়া শনিবার সকাল ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল—এমন অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা ২৫০টির বেশি ট্রেন এবং স্থানীয় ট্রেনের চলাচল বাতিল করা হয়েছে।

শুক্রবার রাত ১০টা থেকে জনপথ-কর্তব্য পথ মোড়ের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে।

এর আগে গত ২০ জুলাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলাকালে দিল্লিতে বিশৃঙ্খলা ও পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর পদত্যাগ করেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। আগের ঘটনার অভিজ্ঞতা এবারের বিক্ষোভের পরিস্থিতিকে ভিন্ন রূপ দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এসব বিধিনিষেধের মধ্যেও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। তাঁর ভাষ্য, স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকেরা জন্তর মন্তরে বিক্ষোভের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাবেন।

বিক্ষোভের কারণে জনদুর্ভোগের যুক্তি তুলে ধরে পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি। অভিজিৎ দিপকে বলেন, ‘একদিকে আপনারা বলছেন, বিক্ষোভের কারণে মানুষের অসুবিধা হবে। অন্যদিকে, আপনারাই মেট্রো, রেল বন্ধ করে দিয়েছেন এবং সড়ক অবরুদ্ধ করেছেন। এতে কি মানুষের অসুবিধা হবে না?’

কে এই ধ্রুব রাঠি

ভারতের রাজনীতি ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী ভিডিও তৈরি করে পরিচিতি পেয়েছেন ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। জার্মানিতে বসবাস করলেও ভারতের রাজনীতি, সরকার ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করেন তিনি। সম্প্রতি ককরোচ জনতা পার্টির কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নেওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এই কনটেন্ট নির্মাতা।

ধ্রুব রাঠির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের রোহতকে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। হিন্দু জাট পরিবারে বেড়ে ওঠা ধ্রুবের বাবা মহাবীর রাঠি এবং মা উর্মিলা রাঠি।

ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে, পারিবারিক পরিবেশ থেকে কঠোর পরিশ্রম, শ্রদ্ধাবোধ ও জানার আগ্রহের মতো মূল্যবোধ অর্জন করেন তিনি। সুশিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠার সুবাদে বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সমসাময়িক ঘটনাবলির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। হরিয়ানায় কাটানো শৈশব তাঁর ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাজীবন গঠনে ভূমিকা রাখে।

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা

মাত্র ১৭ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে যান ধ্রুব রাঠি। সেখানে কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (কেআইটি) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে একই প্রতিষ্ঠান থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

প্রকৌশল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে তাঁর পড়াশোনা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে।

নিজের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে ধ্রুব রাঠি লিখেছেন, “বর্তমানে আমি জার্মানিতে বসবাস করলেও ভারত সব সময়ই আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটি দেশ হয়ে থাকবে। আমি নিয়মিত ভারতে যাতায়াত করি। আমার কনটেন্টের মাধ্যমে দেশটির অগ্রগতি ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি।”

যেভাবে শুরু ইউটিউব যাত্রা

২০১৩ সালে জার্মানিতে কলেজজীবনে থাকাকালে ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশ শুরু করেন ধ্রুব রাঠি। প্রথম দিকে প্রযুক্তি ও পরিবেশবিষয়ক নানা বিষয় ছিল তাঁর ভিডিওর মূল বিষয়বস্তু। শুরুতে নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নিয়ে চ্যানেলটি চালু করেননি তিনি। বরং নিজের জ্ঞান অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করার আগ্রহ থেকেই এর সূচনা হয়েছিল বলে ওয়েবসাইটে উল্লেখ করেছেন।

তবে ২০১৪ সালে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের কার্যক্রম ও পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে তৈরি একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তাঁর ক্যারিয়ারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। ধ্রুব রাঠির ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিওটি তাঁর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল। এরপর রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতি ও সামাজিক সমস্যার পাশাপাশি ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ও তাঁর ভিডিওতে জায়গা করে নেয়। জটিল বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করা এবং তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করা তাঁর কনটেন্টের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

একাধিক প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয়তা

মূল ইউটিউব চ্যানেলের পাশাপাশি ২০১৮ সালে ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে ‘ধ্রুব রাঠি ব্লগস’ নামে আরেকটি চ্যানেল চালু করেন তিনি। পরে তাঁর বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দর্শক ও অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

২০২২ সালে তাঁর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সাবস্ক্রাইবার ও অনুসারীর মোট সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে ভারতের জনপ্রিয় ইউটিউবারদের মধ্যে তাঁর অবস্থান আরও দৃঢ় হয়।

২০২৩ সালে নাস একাডেমির সঙ্গে যৌথভাবে ‘ধ্রুব রাঠি একাডেমি’ চালু করেন তিনি। এই প্ল্যাটফর্মে সময় ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কোর্স নিয়ে আসেন।

ধ্রুব রাঠির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রধান ইউটিউব চ্যানেল ‘@DhruvRathee’-এর সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৩ কোটি ৩০ লাখ। ভ্রমণবিষয়ক চ্যানেল ‘@DhruvRatheeVlogs’-এ সাবস্ক্রাইবার রয়েছেন ৩৫ লাখ ৩০ হাজার।

এ ছাড়া ইনস্টাগ্রামে ‘@dhruvrathee’ অ্যাকাউন্টে তাঁর অনুসারী ১ কোটি ৯১ লাখ। ফেসবুকে ‘@DhruvRathee’ পেজের অনুসারী ৭৬ লাখ এবং এক্সে ‘@dhruv_rathee’ অ্যাকাউন্টে অনুসারীর সংখ্যা ৩৩ লাখ।

বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর এই উপস্থিতি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ভিত্তিক কনটেন্টের বিস্তৃতি তুলে ধরে।

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নতুন আলোচনা

দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সরকার, রাজনীতি, সামাজিক পরিস্থিতি ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন ধ্রুব রাঠি। তবে অনলাইনে বিশ্লেষণধর্মী কনটেন্ট তৈরির পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নেওয়ায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বেঙ্গালুরুতে ককরোচ জনতা পার্টির কর্মসূচিতে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য কর্মসূচির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে সেখানে যাননি বলে তাঁর মন্তব্যও গুরুত্ব পেয়েছে।

জার্মানিতে বসবাস করেও ভারতের রাজনীতি ও সামাজিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করে আসছেন ধ্রুব রাঠি। অনলাইনে বিশ্লেষণধর্মী ভিডিওর মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া এই ইউটিউবারের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরাসরি অংশগ্রহণ তাঁর অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পড়ুন : ২৫ লাখ বছরের গোপন গল্প বলেই যাচ্ছে রক্তের ঝরনা!

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন