দেশের জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন হ্রাসের কারণ অনুসন্ধান এবং উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যকর উপায় খুঁজে বের করতে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে সরকার। নদীর নাব্যতা সংকট, দূষণ ও ডুবোচরসহ বিভিন্ন কারণে ইলিশের সরবরাহ কমছে উল্লেখ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এ ক্ষেত্রে জেলেদের সচেতনতা, সহযোগিতা এবং মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখা জরুরি।
মঙ্গলবার দুপুরে চাঁদপুরে ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান’ বাস্তবায়ন উপলক্ষে জেলেদের মধ্যে ভিজিএফের চাল বিতরণ ও জনসচেতনতামূলক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ইলিশের উৎপাদন হ্রাসের পেছনে যেসব কারণ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির উপায় বের করার জন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করছে সরকার। নদীর নাব্যতা সংকট, দূষণ ও ডুবোচরের মতো সমস্যা ইলিশের বিচরণ ও সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করতে হলে মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জেলেদের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সংরক্ষণ অভিযান তখনই কার্যকর হবে, যখন জেলেরা নিষেধাজ্ঞা মেনে চলবেন এবং ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে সহযোগিতা করবেন।
মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে সচেতনতার ওপর গুরুত্ব
ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ এবং নির্ধারিত সময়ে জাটকা সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ইলিশের জীবনচক্র সুরক্ষিত রাখতে প্রজননক্ষম মা ইলিশ নিধন বন্ধ করা এবং ছোট ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। এ জন্য জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সংরক্ষণ অভিযান বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও মৎস্যজীবীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
ইলিশ সংরক্ষণকে কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন ও জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তারের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে। এ জন্য সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ এবং নদীর পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের খাদ্যসহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থান
ইলিশের অভয়াশ্রম ও সংরক্ষণ অভিযান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জেলেদের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার। মন্ত্রী জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের খাদ্যসহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইলিশ সংরক্ষণের স্বার্থে নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদের পাশে থাকতে হবে। খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা গেলে সংরক্ষণকালীন সময়ে তাঁদের আর্থিক চাপ কমবে। এতে জেলেদের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার আগ্রহ বাড়বে এবং ইলিশের প্রজনন সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অভিযান পর্যবেক্ষণ, সভায় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা
এর আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী চাঁদপুরে নদীতে পরিচালিত অভিযান পর্যবেক্ষণ করেন। মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখা এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা সম্পর্কে তিনি অবহিত হন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. খালেদ কনক, চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এ কে এম সলিম উল্লাহ সেলিম।
এ ছাড়া সভায় মৎস্যজীবী এবং বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষা, নদীর পরিবেশের উন্নয়ন, নাব্যতা সংকটের কারণ চিহ্নিত করা এবং জেলেদের সহযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের চলমান সংরক্ষণ উদ্যোগের পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা আরও জোরদার হতে পারে।


