একটি মাত্র হার্ট চেম্বার, হাতে সময় কম: বাঁচার আকুতি কলমাকান্দার শিশু মাহিরার

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলা। এই উপজেলার খারনৈ ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী বিশ্বনাথপুর, যার ঠিক ওপারেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সুবিশাল পাহাড়সারি। সবুজে ঘেরা শান্ত গ্রামেরই সাধারণ এক পরিবারের সন্তান মো. মজিবুর রহমান ও তার স্ত্রী রোজিনা আক্তার। বিয়ের পর তাদের ছোট্ট সংসার আলোকিত করে পৃথিবীতে আসে ফুটফুটে কন্যাশিশু, আদর করে যার নাম রাখা হয় মাহিরা রহমান ওরফে মাহিরা।

বিজ্ঞাপন

সুস্থ ও সুন্দর শিশুর আগমনে পরিবারটিতে অনাবিল আনন্দের বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তা আজ পরিণত হয়েছে গভীর ও মর্মান্তিক এক বিষাদে। শিশু মাহিরার বয়স এখন মাত্র ৫ মাস ৩ দিন।

বিছানায় শুয়ে থাকা একরত্তি শিশুটি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে পৃথিবীর দিকে, কখনো বা মিষ্টি করে হাসছে, আবার কখনো ছোট্ট হাত-পা ছুঁড়ে আপন মনে খেলছে। তাকে দেখে বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় নেই, মায়াবী চেহারার আড়ালে তার ছোট্ট বুকের ভেতর বাসা বেঁধেছে মরণঘাতী রোগ। যে শিশুটি হয়তো প্রাপ্ত বয়স্কে এই সমাজের, এই দেশের এক গর্বিত সন্তান হতে পারতো, সে আজ তার জীবনের প্রথম প্রহরেই মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে অসম এক যুদ্ধে লড়ছে।

মাহিরার জন্মগ্রহণের আনন্দ কয়েকদিন যেতে না যেতেই ম্লান হয়ে যায়। জন্মের পর থেকেই শিশুটির শরীর অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে থাকে। আতঙ্কিত পিতা-মাতা তাকে নিয়ে ছুটে আসেন ঢাকার হাসপাতালে। লালমাটিয়ার একটি হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) দীর্ঘ ১০ দিন চিকিৎসাধীন থাকে সে। সেখানেই গত ২৫ মে শিশুটির ইকোকার্ডিওগ্রাফি (ইকো) পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার রিপোর্টে চিকিৎসকরা যা জানান, তা এক মুহূর্তে মজিবুর রহমানের (শিশুটির পিতা) মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। ডা. রুবাবা শারমিনের করা সেই রিপোর্টে ধরা পড়ে, শিশুটি জন্মগতভাবেই হৃদপিণ্ডের চরম জটিল ত্রুটি নিয়ে জন্মেছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় রোগটির নাম ‘ডাবল ইনলেট লেফট ভেন্ট্রিকল’ বা সিঙ্গেল ভেন্ট্রিকল। অর্থাৎ, স্বাভাবিক মানুষের হৃদপিণ্ডে যেখানে দুটি প্রকোষ্ঠ কাজ করে, সেখানে মাহিরার হৃদপিণ্ডে কাজ করছে মাত্র একটি। এছাড়াও তার হার্টে রয়েছে বড় আকারের ছিদ্র এবং হাইপোপ্লাস্টিক রাইট ভেন্ট্রিকল। ফলে তার হৃদপিণ্ড থেকে ফুসফুসে অতিরিক্ত রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, যা তার জীবনকে করে তুলেছে চরম সংকটাপন্ন।

শত বিপত্তিতেও হাল ছাড়েননি বাবা মজিবুর রহমান। সন্তানকে বাঁচাতে তিনি ছুটে গেছেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের মতো দেশের স্বনামধন্য চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে। বর্তমানে শিশুটি প্রখ্যাত শিশু কার্ডিওলজিস্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক ডা. নুরুন নাহার ফাতেমা এবং ডা. ইলিয়াস পাটোয়ারীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

চিকিৎসকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মাহিরাকে বাঁচাতে হলে ধাপে ধাপে তিনটি জটিল ওপেন হার্ট সার্জারি করতে হবে। যার প্রথম ধাপটির নাম ‘পিএ ব্যান্ডিং’। কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রথম সার্জারিটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, এতে শিশুর মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক বেশি। তাই চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ভারতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ আশঙ্কার কথা হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী এই অপারেশনটি শিশুর ৬ মাস বয়সের মধ্যেই সম্পন্ন করা বাঞ্ছনীয়। তা না হলে সাফল্যের হার একেবারেই কমে যায়। মাহিরার বর্তমান বয়স ইতিমধ্যেই ৫ মাস ৩ দিন পেরিয়ে গেছে। অর্থাৎ, তাকে বাঁচানোর জন্য হাতে সময় আছে মাত্র আর কয়েকটা দিন।

এমন জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার পথে বিশাল দুর্ভেদ্য এক প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ। মজিবুর রহমান ঢাকায় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে লজিস্টিক কো-অর্ডিনেটর হিসেবে চাকরি করেন। তার মাসিক আয় সব মিলিয়ে ২২ হাজার টাকা। সামান্য এই আয়ে যেখানে ঢাকায় সংসার চালানোই দায়, সেখানে মেয়ের চিকিৎসার পাহাড়সম ব্যয় মেটানো তার কাছে এক অকল্পনীয় দুঃস্বপ্ন। সন্তানের চিকিৎসায় তিনি ইতিমধ্যেই তার জমানো অর্থ, আত্মীয়-স্বজন ও অফিসের সহকর্মীদের সাহায্য নিয়ে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা ব্যয় করে ফেলেছেন। বর্তমানে তিনি প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো ঋণগ্রস্ত। গ্রামের বাড়িতেও বিক্রি করে টাকা জোগাড় করার মতো কোনো জমিজমা অবশিষ্ট নেই। ভারতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানোর মতো ন্যূনতম আর্থিক সংস্থান এখন এই অসহায় বাবার নেই।

এক অসহায় পিতার অশ্রুসিক্ত আর্তনাদ কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি আমাদের পুরো সমাজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন। আজ ফুটফুটে শিশুটি সমাজের সকল শ্রেণির ও পেশার বিত্তবান, দয়ালু ও মানবিক মানুষদের দিকে বুক ভরা আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। আপনাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ও সামান্য একটু আর্থিক সহায়তায় হয়তো বেঁচে যেতে পারে কলমাকান্দার সীমান্ত ঘেঁষা গ্রামের ছোট্ট এই প্রাণটি।

মাহিরা চায় বাঁচতে, সে চায় পৃথিবীর আলো-বাতাসে বেড়ে উঠতে। আসুন, আমরা সবাই মিলে আমাদের মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিই, নিশ্চিত করি যেন সম্ভাবনাময়ী এই শিশুটি ফোটার আগেই অকালে ঝরে না যায়।

পড়ুন:নরসিংদীর চৌয়ায় বিএনপির কার্যালয় ভাঙচুর, গুলি ছুড়ে দুর্বৃত্তরা

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন