মুক্তির আগে দুই বছর ধরে অপেক্ষায় ছিল সিনেমাটি। ভারতের কোনো পরিবেশকই ছবিটি মুক্তি দিতে আগ্রহ দেখাননি। অথচ শেষ পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে দর্শক ও চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্রশংসা কুড়াচ্ছে ১১১ মিনিটের সিনেমা ‘পায়ার’। মুক্তির আগেই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ১৮টি পুরস্কার পাওয়া ছবিটি এখন আলোচনায় উঠে এসেছে ব্যতিক্রমী গল্প ও আবেগঘন নির্মাণের কারণে।
উত্তর ভারতের উত্তরাখন্ডের একটি পাহাড়ি গ্রামের বৃদ্ধ দম্পতির ভালোবাসা, নিঃসঙ্গতা ও দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। এর পরিচালক বিনোদ কাপরি। টেলিভিশন সাংবাদিকতা থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে আসা এই পরিচালক ছবিতে অভিনয়ের জন্য বেছে নিয়েছেন গ্রামের দুই সাধারণ মানুষ পদম সিং ও হীরা দেবীকে। এর আগে তাঁদের অভিনয়ের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। অথচ পর্দায় তাঁদের স্বাভাবিক অভিনয়ই দর্শকদের আবেগাপ্লুত করছে।
পায়ার’ সিনেমার গল্পে রয়েছে ৬৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে থাকা এক বৃদ্ধ দম্পতি। তাঁদের ছেলে হারিয়া কাজের সন্ধানে মুম্বাইয়ে চলে গেছে। সেই ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষায় কেটে গেছে ২৮ বছর। প্রতিদিনই তাঁরা আশা করেন, একদিন হয়তো ছেলে বাড়িতে ফিরবে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে গ্রামের চিত্র। জীবিকার সন্ধানে একে একে গ্রামের তরুণেরা অন্যত্র চলে গেছেন। একসময় প্রাণচঞ্চল পাহাড়ি জনপদ প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। বৃদ্ধ দম্পতির পাশে দাঁড়ানোর মতো প্রতিবেশীও আর অবশিষ্ট থাকে না।
সিনেমার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দৃশ্যগুলোর একটি হলো পদম সিংয়ের বাড়ির সামনে পাশাপাশি দুটি চিতা তৈরি করা। মৃত্যুর পর পাহাড় থেকে তাঁদের মরদেহ নামানোর মতো কেউ থাকবে না—এই আশঙ্কা থেকেই নিজের ও স্ত্রীর জন্য দুটি চিতা তৈরি করেন তিনি। দৃশ্যটি পাহাড়ি অঞ্চলের জনশূন্যতা, বার্ধক্যের অসহায়ত্ব এবং সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মা-বাবার বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
তবে ছবিটি কেবল বিষণ্নতা আর একাকিত্বের গল্প নয়। বৃদ্ধ দম্পতির খুনসুটি, হাস্যরস এবং দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের ছোট ছোট আনন্দও তুলে ধরেছেন পরিচালক। ফলে দর্শকেরা একই সঙ্গে হাসি ও কান্নার অভিজ্ঞতা পান।
২০১৮ সালে উত্তরাখন্ডের মুন্সিয়ারিতে এক বৃদ্ধ দম্পতির সঙ্গে দেখা হয়েছিল বিনোদ কাপরির। তাঁদের জীবনযাপন, নিঃসঙ্গতা ও সন্তানদের জন্য অপেক্ষার গল্প পরিচালকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। সেখান থেকেই সিনেমাটি নির্মাণের ভাবনা আসে।
প্রথমে ওই দম্পতিকে নিয়েই ছবি তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। পরে নিজের চাচা পদম সিং এবং অন্য গ্রামের হীরা দেবীকে অভিনয়ের জন্য নির্বাচন করেন। তাঁদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা ও স্বাভাবিক অভিব্যক্তি সিনেমাটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
২০২৪ সাল থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে ‘পায়ার’। পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, সেরা ফিচার ফিল্ম বিভাগে তিনটি পুরস্কারসহ ছবিটি মোট ১৮টি পুরস্কার পেয়েছে।
এত অর্জনের পরও পরিবেশক না পাওয়ায় সিনেমাটির প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত গত ৩০ অক্টোবর মাত্র ৭০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয় ছবিটি। তবে দর্শকদের ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর ধীরে ধীরে প্রদর্শনীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
ছবির অভিনেত্রী হীরা দেবীর মতে, সিনেমাটি দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে, কারণ ভারতের অনেক গ্রামেই বৃদ্ধ মা-বাবারা সন্তানদের অপেক্ষায় একাকী জীবন কাটান। তাঁদের জীবনের এই বাস্তবতা দর্শকের কাছে পরিচিত ও আবেগঘন।
অন্যদিকে পদম সিংয়ের প্রত্যাশা, মানুষের কাছে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া হোক। যাতে জীবিকার প্রয়োজনে তরুণদের নিজের গ্রাম ও মাতৃভূমি ছেড়ে দূরে চলে যেতে না হয়।
বড় তারকা কিংবা বিপুল বাজেট ছাড়াই একটি সিনেমা যে শক্তিশালী গল্পের মাধ্যমে দর্শকের মন জয় করতে পারে, ‘পায়ার’ তারই উদাহরণ। পরিবেশকদের অনাগ্রহ পেরিয়ে ছবিটির এই সাফল্য ভারতীয় স্বাধীন ও বিকল্পধারার চলচ্চিত্রের জন্যও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার গল্প।
পড়ুন:কথিত প্রেমিক হর্ষ মেহতাকে নিয়ে দীপাবলি পার্টিতে মালাইকা
ইমি/


