ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির তথ্য দিলে ২ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারলে সর্বোচ্চ ২ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৫০ কোটি টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু অর্থ পুরস্কারই নয়, তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে তাঁকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও করবে মার্কিন সরকার। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সরঞ্জাম, বিজ্ঞানী, গবেষক এবং কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য পেতে এই উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ ঘোষণা জানায়। এতে বলা হয়, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির আওতায় তথ্যদাতাদের এই পুরস্কার দেওয়া হবে।

ঘোষণা অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রযুক্তি, সরঞ্জাম এবং এ কার্যক্রমে যুক্ত বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সম্পর্কে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কী ধরনের তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো শর্ত প্রকাশ করেনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

তথ্যদাতার নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ১৯৮৪ সালে ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি চালু করা হয়। এ কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হয়।

কর্মসূচিটির বিশেষ দিক হলো, তথ্যদাতার নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রয়োজন হলে তথ্যদাতা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারে মার্কিন সরকার। ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্য দিতে আগ্রহীদের জন্য নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে ওয়াশিংটন।

আইএইএর নজরদারি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ

পুরস্কার ঘোষণার পেছনে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। তাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিরাপত্তাবিষয়ক বাধ্যবাধকতা ইরান যথাযথভাবে পালন না করায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কার্যকর নজরদারি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি তৈরি, সংরক্ষণ ও মজুতের বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা গেলেও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এ কারণে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়।

ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যত পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। শুক্রবার রাতে ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা না চালালে বর্তমানে ইসরায়েলের অস্তিত্ব থাকত না। তাঁর দাবি, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে দেশটি তা ব্যবহার করত এবং এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংসের মুখে পড়ত।

তিনি আরও দাবি করেন, আট মাসের যুদ্ধে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তেহরান এখন যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি করতে আগ্রহী।

ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা এখন তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। তারা একটি চুক্তি করতে চায়।’

তবে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এসব দাবি ও বক্তব্যের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে মার্কিন অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান।

যুদ্ধ এড়াতে চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা

নতুন করে যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরু না হয়, সে জন্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। সংকটের সমাধানে আলোচনার পথ খোলা রাখার চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

গত মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও জানিয়েছেন, তাঁর সরকার এখনো আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে। ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়েও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।

এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানে আরও দুয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবস্থা নেওয়া বাকি রয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে মধ্য ইরানের পিকঅ্যাক্স পর্বতও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, সেখানে ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে। তবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।

সব মিলিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পুরস্কার ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ওয়াশিংটনের তৎপরতা বাড়ছে, অন্যদিকে যুদ্ধ এড়াতে চলছে কূটনৈতিক আলোচনা। এখন দেখার বিষয়, নতুন এই উদ্যোগ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা তথ্য দিতে পারে এবং চলমান সংকট সমাধানে আলোচনার পথ কতটা এগিয়ে যায়।

পড়ুন:ক্ষমতাচ্যুত প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট পেনা গৃহবন্দি, নতুন দায়িত্বে আলিয়ানা

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন