সরকারি আয়োজনে বিশেষ দিবসের আলোচনা সভা চলছিল বেশ শান্ত ও আনুষ্ঠানিক পরিবেশেই। মঞ্চে উপবিষ্ট প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। কিন্তু স্বাগত বক্তব্যের মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই বদলে গেল পুরো মিলনায়তনের আবহ। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য দিতে গিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারণ না করায় মুহূর্তেই ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে। তবে সেই উত্তাপ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি; পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা পুনরায় মঞ্চে উঠে দুঃখ প্রকাশ ও দিবসের মূল তাৎপর্য তুলে ধরলে আবারও শান্ত ও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে সভাকক্ষ।
শনিবার (৭ নভেম্বর) দুপুরে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলরুমে এ ঘটনা ঘটে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে মোহনগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
সভার শুরু থেকেই মিলনায়তনটি ছিল সরকারি দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে মুখর। অনুষ্ঠানের মূল ব্যানারে প্রধান অতিথি হিসেবে স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবরের নাম মুদ্রিত থাকলেও তিনি সভায় উপস্থিত ছিলেন না। মঞ্চে ও দর্শক সারিতে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন, মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম হারুন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি সেলিম কার্নায়েন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম এরশাদুর রহমান এবং পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুজ্জামান ফরিদসহ উপজেলা ও পৌর বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীবৃন্দ।
আলোচনা সভার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর একপর্যায়ে স্বাগত বক্তব্য দেওয়ার জন্য মঞ্চে আহ্বান জানানো হয় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদকে। তিনি তার প্রারম্ভিক বক্তব্য শেষ করে আসনে ফিরে যাওয়ার পরই মূলত অসন্তোষের সূত্রপাত হয়। উপস্থিত বিএনপি নেতাকর্মীরা লক্ষ্য করেন, ৭ নভেম্বরের মতো একটি ঐতিহাসিক দিবসের আলোচনায় শিক্ষা কর্মকর্তা তার পুরো বক্তব্যে একবারও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করেননি।
বিষয়টি নিয়ে দর্শক সারিতে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রথমে গুঞ্জন এবং পরক্ষণেই তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং মঞ্চে বসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গিয়ে এ বিষয়ে নিজেদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার কথা জানান। এতে পুরো মাল্টিপারপাস হলরুমে এক ধরনের অস্বস্তিকর ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির তৈরি হয়।
সভায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের এমন তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদ। পরিস্থিতি শান্ত করতে তিনি নিজের আসন ছেড়ে পুনরায় ডায়াসে ফিরে যান। দ্বিতীয় দফার বক্তব্যে তিনি আগের অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য উপস্থিত সকলের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট, দিবসের তাৎপর্য এবং তৎকালীন সংকটময় মুহূর্তে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবিস্মরণীয় নেতৃত্বের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তার ইতিবাচক ও সৌজন্যমূলক পদক্ষেপের পর পরই মিলনায়তনের উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং সভার স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়।
ঘটনার বিষয়ে নিজেদের অবস্থানের কথা জানিয়ে পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুজ্জামান ফরিদ বলেন, ৭ নভেম্বরের ইতিহাসের সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁকে বাদ দিয়ে বা তাঁর নাম উচ্চারণ না করে এই দিবসের কোনো আলোচনা পূর্ণতা পেতে পারে না, এমনকি দিবসের কোনো অর্থও থাকে না। শিক্ষা কর্মকর্তা তার স্বাগত বক্তব্যে একবারও জিয়াউর রহমানের নাম না নেওয়ায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং তারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তবে পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তা নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে দুঃখ প্রকাশ করায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
একই প্রসঙ্গে উপজেলা বিএনপির সভাপতি সেলিম কার্নায়েন জানান, দিবসের মূল নায়ক জিয়াউর রহমানের নামটিই বক্তব্যে অনুপস্থিত থাকায় স্বাভাবিকভাবেই নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে শিক্ষা কর্মকর্তা বিষয়টি দ্রুত অনুধাবন করে পুনরায় মঞ্চে এসে দুঃখ প্রকাশ করায় নেতাকর্মীরা শান্ত হন এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
অন্যদিকে, পুরো বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদ। তিনি জানান, অনুষ্ঠানে তাকে মূলত প্রারম্ভিক বা স্বাগত বক্তব্য দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এজন্য আগে থেকে কোনো লিখিত বক্তব্য বা নির্ধারিত স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত করা ছিল না। তাৎক্ষণিকভাবে মঞ্চে উঠে স্বাগত বক্তব্য দেওয়ার কারণে আলোচ্য প্রসঙ্গে জিয়াউর রহমানের নামটি আসেনি। তা ছাড়া নিছক স্বাগত বক্তব্যে নামটি উল্লেখ করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি ওই মুহূর্তে মনে করেননি।
হাসান মোহাম্মদ জুনায়েদ আরও জানান, তার বক্তব্য শেষ হওয়ার পর একজন এসে মঞ্চে উপবিষ্ট ইউএনওর কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দর্শক সারিতে থাকা কয়েকজনকে বেশ উত্তেজিত দেখা যায়। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি নিজেই আবার মঞ্চে গিয়ে বক্তব্য দেন এবং বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার করেন। দ্বিতীয়বার বক্তব্যে সাত নভেম্বরের তাৎপর্য ও জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের বিষয়টি তুলে ধরার পর সবাই আশ্বস্ত হন এবং পরিবেশ শান্ত হয়।
দিবসটি ঘিরে সাময়িক ছন্দপতন ঘটলেও শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক সমঝোতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়েই মোহনগঞ্জে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনা সভাটি সমাপ্ত হয়েছে।
পড়ুন : কসবায় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের কর্মসূচিতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ


