আন্তর্জাতিক খালের স্থায়িত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণ নির্দিষ্ট সময় পরপর ড্রেজিং (পলি অপসারণ) ও কংক্রিটের পাড় মেরামত করা হয়। ফলে এগুলো শত বছর ধরে একই রকম থাকে। কিন্ত এইদেশের খাল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পলি জমে এগুলো দ্রুত ভরাট হয়ে যায়। এছাড়া কচুরিপানা ও অবৈধ দখলের কারণে অনেক খাল অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।
খাল হলো মানুষের তৈরি কৃত্রিম জলপথ, যা মূলত নৌযান চলাচল, কৃষিকাজে সেচ প্রদান, নিষ্কাশন বা পানি সরবরাহের উদ্দেশ্যে খনন করা হয়। প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি নদীর সাথে এর মূল তফাত এখানেই এটি সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট। সহজ কথায়, উন্নত বিশ্বের বা বিদেশি বড় খালগুলো হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মহাসড়ক, আর বাংলাদেশের খালগুলো হলো মূলত কৃষি, স্থানীয় যোগাযোগ এবং প্রকৃতির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার লাইফলাইন।
খাল মূলত দুই ধরনের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তৈরি করা হয়:
জলপথ বা নৌ-চলাচল খাল: এই খালগুলো বিভিন্ন নদী, হ্রদ বা মহাসাগরকে নিজেদের মধ্যে যুক্ত করে জাহাজ ও নৌকা চলাচলের পথ তৈরি করে। এর ফলে সমুদ্রপথে যাতায়াতের দূরত্ব এবং সময় অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। যেমন: সুয়েজ খাল বা পানামা খাল।
পানি সরবরাহ ও সেচ খাল : এই খালগুলো কৃষিকাজে পানি দেওয়ার জন্য নদী বা জলাশয় থেকে শুষ্ক অঞ্চলে পানি নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়।
লক সিস্টেম: অনেক সময় দুটি ভিন্ন জলাশয়ের পানির উচ্চতা সমান থাকে না। তখন জাহাজের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখতে খালের মধ্যে বিশেষ এক ধরণের “লক গেট” বা লিফট ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, যা পানি বাড়িয়ে বা কমিয়ে জাহাজকে উপরে-নিচে ওঠানামা করায় (যেমন পানামা খালে এটি দেখা যায়)।
বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার বড় খালের পাশাপাশি গ্রামগঞ্জে লাখ লাখ ছোট ছোট সেচ খাল ও ড্রেনেজ খাল রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নৌ-চলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ খালের সংখ্যা কয়েকশ’র কাছাকাছি।
বিশ্বের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী প্রধান ও বৃহৎ খাল মূলত ৫টি।
সুয়েজ খাল যা মিসরে অবস্থিত। এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিখ্যাত কৃত্রিম খাল। এটি ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে যুক্ত করেছে। এই খালটি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সরাসরি সামুদ্রিক যোগাযোগের পথ তৈরি করেছে, যার ফলে জাহাজগুলোকে আর পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে (উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে) আসতে হয় না। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২% এই খাল দিয়ে সম্পন্ন হয়।
পানামা খাল পানামা এটি আটলান্টিক মহাসাগরকে প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। এই খাল তৈরির আগে আমেরিকান অঞ্চলের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ার জন্য পুরো দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ ঘুরে আসতে হতো। প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন এই খালটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সময় ও খরচ ব্যাপক হারে কমিয়ে দিয়েছে।
গ্র্যান্ড ক্যানেল চীনে অবস্থিত। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম এবং প্রাচীনতম মানবসৃষ্ট খাল। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৭৭৬ কিলোমিটার। এটি চীনের বেইজিং এবং হাংচৌ শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। ইয়াংসি নদী এবং হলুদ নদীকে যুক্ত করা এই খালটি প্রাচীনকাল থেকেই চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে।
কিল খাল জার্মানিতে এর অবস্থান। এটি উত্তর সাগরকে (ঘড়ৎঃয ঝবধ) বাল্টিক সাগরের (ইধষঃরপ ঝবধ) সাথে যুক্ত করেছে। জার্মানির জুটল্যান্ড উপদ্বীপের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই খালটি ব্যবহারের ফলে জাহাজগুলোকে আর ডেনমার্ক ঘুরে যেতে হয় না, যা অত্যন্ত নিরাপদ এবং সময় সাশ্রয়ী। এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত কৃত্রিম জলপথ।
এরি খাল এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। এই খালটি নিউইয়র্কের হাডসন নদীকে গ্রেট লেকসের (এৎবধঃ খধশবং) অন্তর্ভুক্ত ইরি হ্রদের সাথে যুক্ত করেছে। ১৯ শতকে নির্মিত এই খালটি নিউইয়র্ককে আমেরিকার অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করতে এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।
খালের পরিমাপ মূলত নির্ভর করে সেটি কী উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে তার ওপর। একটি ছোট সেচ খালের পরিমাপ আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খালের পরিমাপের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত থাকে। বিদেশি খালের সাথে বাংলাদেশের খালের মূল পার্থক্যগুলো হলো।
ছোট বা সেচ খাল এগুলো সাধারণত ২ থেকে ৫ মিটার (৬-১৬ ফুট) চওড়া এবং ১ থেকে ২ মিটার (৩-৬ ফুট) গভীর হয়। দৈর্ঘ্য হতে পারে কয়েকশ মিটার থেকে কয়েক কিলোমিটার। মাঝারি বা আঞ্চলিক নৌ-চলাচল খাল: এগুলো সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ মিটার (৫০-১০০ ফুট) চওড়া এবং ৩ থেকে ৫ মিটার গভীর হয়। এগুলো দিয়ে ছোট ট্রলার বা কার্গো চলাচল করে।
বৃহৎ বা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল খাল: এই খালগুলো বিশাল হয়। উদাহারন স্বরূপ বলা যায়, সুয়েজ খাল, এটি প্রায় ২০৫ মিটার (৬৭৩ ফুট) চওড়া এবং ২৪ মিটার (৭৮ ফুট) গভীর। এর দৈর্ঘ্য ১৯৩ কিলোমিটার।
পানামা খাল এর লক বা পকেটগুলোর চওড়া প্রায় ৩৩.৫ মিটার থেকে ৫৫ মিটার এবং গভীরতা ১৮.৩ মিটার। এর দৈর্ঘ্য ৮২ কিলোমিটার।
বিদেশি খালের সাথে বাংলাদেশের খালের পার্থক্য
আন্তর্জাতিক বা উন্নত বিশ্বের খালের সাথে বাংলাদেশের খালের গঠন, উদ্দেশ্য এবং ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক খাল: সুয়েজ খালে বিশাল মালবাহী জাহাজ. ঝড়ঁৎপব: ঠবংংবষ ঋরহফবৎ প্রধান পার্থক্যগুলো হলো: বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্র বিদেশি-আন্তর্জাতিক খাল (যেমন: সুয়েজ, পানামা, কিল) বাংলাদেশের খাল (যেমন: মাদারীপুর বিল রুট খাল, গ্রামীণ খাল)
তৈরি ও উৎস এগুলো সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে, আধুনিক প্রকৌশল ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে খনন বা কংক্রিট দিয়ে তৈরি করা হয়।বাংলাদেশের অধিকাংশ খালই প্রাকৃতিক নদীর শাখা বা মৃতপ্রায় নদী, যেগুলোকে পরে মানুষ খনন করে খালের রূপ দিয়েছে।
মূল উদ্দেশ্য প্রধান উদ্দেশ্য হলো এক মহাসাগর থেকে অন্য মহাসাগরে বা দেশে বড় বড় কন্টেইনার জাহাজ পারাপার করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখা। মূল উদ্দেশ্য হলো স্থানীয়ভাবে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া, বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করা এবং ছোট নৌকা বা ট্রলার চলাচল।
নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তি এই খালগুলোতে আধুনিক ‘লক সিস্টেম’, পানির স্তর নিয়ন্ত্রক গেট এবং জাহাজ ট্র্যাকিংয়ের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকে।বাংলাদেশের খালে সাধারণত কোনো লক সিস্টেম থাকে না। কিছু খালে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য সাধারণ স্লুইস গেট (ঝষঁরপব এধঃব) থাকে। গভীরতা ও আকার এগুলো অত্যন্ত গভীর (১৫ থেকে ২৪ মিটার পর্যন্ত) এবং চওড়া হয়, যাতে লাখো টনের জাহাজ চলতে পারে। এগুলো বেশ অগভীর (সাধারণত ২ থেকে ৫ মিটার) এবং সরু হয়। বড় জাহাজ এখানে চলতে পারে না।
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রবাহিত নদী গুলো মৃত প্রায়। খাল গুলো প্রান ফিরে পাই নদীর পানিতে আর নদীর পানি সংকট পূরণে নির্ভর করতে বহিরবিশে^র কাছে। বাংলাদেশ নদী মাত্রিক দেশ শুধু বই-পস্তুকে থাকলেও বাস্তবতা অনেকাংশে বৃহঙ্গণাদের মতো। দেশের অর্থনৈতিক অপচয় আর কন্দল সৃষ্টিই হচ্ছে বর্তমান পূর্ণ খাল খনন। পানি শূন্যতাই আকাশের দিকে চাহিয়া রয়েছে খাল গুলোর পিপাসা মেটাবার।
পড়ুন : শিক্ষার সনদ নয়, প্রজ্ঞা ও জনআস্থায় প্রতিষ্ঠিত সরকার আলী


