বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে নেত্রকোনায় বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার (৭ জুন) বিকেলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নেত্রকোনা জেলা শাখার উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল, “পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলা করি নারীর সংকট নিরসন করি”। নেত্রকোনা পৌরশহরে অজহর রোডস্থ জেলা শাখা কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক দায়িত্ব এবং নারীদের আত্মনির্ভরশীলতার ওপর ব্যাপক আলোচনা করা হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন, রেহানা সিদ্দিকী এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত আন্দোলন সম্পাদক শাম্মী খান।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নেত্রকোনা শাখার সাধারণ সম্পাদক তাহেজা বেগম। এছাড়াও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনা সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. নূরুজ্জামান এবং আবু আব্বাছ ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও পরিবেশবিদ মো. নাজমুল কবীর সরকার।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে তাহেজা বেগম জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও হঠাৎ বৃষ্টির মতো বৈরী আবহাওয়ার কারণে তৃণমূলের কর্মীদের খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। পরিবেশ বলতে শুধু মানুষের বেঁচে থাকাকে বোঝায় না, বরং জীবজন্তুরও এই পরিবেশে বেঁচে থাকার সমান অধিকার রয়েছে। নির্বিচারে পশুহত্যা বা জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হলে তা সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক প্রস্তাবে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে দায়বদ্ধ। তবে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব কেবল সরকারের একার নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ নাগরিকেরও এই সুস্থ, সবুজ ও দূষণমুক্ত পরিবেশ রক্ষায় সমান অংশগ্রহণ থাকতে হবে।
নেত্রকোনা সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. নূরুজ্জামান তার দীর্ঘ বক্তব্যে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রেক্ষাপট ও ১৯৭৪ সাল থেকে এটি পালনের বৈশ্বিক ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, পেটে ক্ষুধা থাকলে পরিবেশ রক্ষার কথা ভাবা বাস্তবসম্মত নয়; তাই আগে নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে।
তার মতে, সমাজের বেশিরভাগ নারী এখনো পরিবারে স্বামী বা পিতার ওপর নির্ভরশীল, যার ফলে তারা ক্ষমতায়ন থেকে পিছিয়ে পড়ছেন। যুব উন্নয়ন, মহিলা বিষয়ক এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু প্রশিক্ষণ নিলেই হবে না, সেগুলোকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে। নেত্রকোনার নারী উদ্যোক্তাদের প্রশংসা করে তিনি জানান, এখানকার নারীরা অন্যান্য পার্শ্ববর্তী জেলার তুলনায় ব্যবসায়িক উদ্যোগে বেশ ভালো করছেন।
মো. নূরুজ্জামান ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যুবসমাজকে দেশের মূল চালিকাশক্তি এবং পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি দেশে চলমান ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনসংখ্যাগত লভ্যাংশকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে তিনি পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহারের কড়া সমালোচনা করে সবাইকে পলিথিন বর্জনের তাগিদ দেন। এছাড়াও ব্যাধি হিসেবে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তিনি কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। ১২-১৩ বছর বয়সী কন্যা শিশুদের বিয়ে না দিয়ে তাদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার এবং সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তিনি উপস্থিত সবার প্রতি আহ্বান জানান।
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নেত্রকোনা জেলা শাখার সহ-সভাপতি সেফালী রানী সাহা, মনিরা আক্তার খাতুনসহ জেলা শাখার সম্পাদক মণ্ডলী ও তৃণমূল শাখার কর্মী-সদস্যবৃন্দ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন। পরিশেষে, সম্মিলিতভাবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, দূষণমুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
পড়ুন : ময়মনসিংহ ডিসি অফিসে ২ বিএনপি নেতার মারপিট, আহত অফিস সহকারি


