বিজ্ঞাপন

সহায়তা কার্ড: স্বজনপ্রীতি ও তালিকায় মৃত ব্যক্তি, ২ নেতাকে এমপির শোকজ

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় সুয়াইর ইউনিয়নে অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত ‘হাওর মানবিক সহায়তা কার্ড’ বিতরণের অগ্রাধিকার তালিকায় অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বঞ্চিত করে মৃত ব্যক্তি, চাকরিজীবী ও এলাকার বাহিরে অবস্থানকারীদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী) আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. লুৎফুজ্জামান বাবর সুয়াইর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এটিএম মোস্তফা জামিল স্বপন ও সাধারণ সম্পাদক বাবুল মিয়াকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছেন।

সোমবার (২২ জুন) প্রতিবেদকের কাছে আসা জাতীয় সংসদের প্যাডে এমপি লুৎফুজ্জামান বাবর স্বাক্ষরিত ওই চিঠি থেকে জানা যায়, সহায়তা কার্ড প্রদানে স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অসংখ্য অভিযোগ এসেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নাম, যাদের নিজস্ব কোনো কৃষি জমি নেই, যারা বর্তমানে এলাকায় থাকেন না কিংবা অন্যত্র স্থায়ী চাকরিতে নিয়োজিত আছেন- এমনকি মৃত ব্যক্তিদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চিঠিতে সংসদ সদস্য কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “কোনো ব্যক্তির দায় দল নেবে না। অতএব অনিয়মের সাথে আপনাদের (সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক) সম্পৃক্ততার দায়ও দল নেবে না।”

সুয়াইর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে চিঠি পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তালিকা সম্পূর্ণ সংশোধন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে, অনিয়মের কারণে কেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তার লিখিত জবাব ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দাখিল করতে বলা হয়েছে। চিঠির অনুলিপি মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বরাবর পাঠানো হয়েছে।

এদিকে, মোহনগঞ্জ উপজেলা বিএনপির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক তানভীর আহমেদ অভিযোগ করেছেন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোস্তফা জামিল স্বপন, সাধারণ সম্পাদক বাবুল মিয়া, ১নং সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কবির চৌধুরী এবং প্যানেল চেয়ারম্যান সোহেল যোগসাজশ করে প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করেছেন। অর্থের বিনিময়ে ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অকৃষক ও আত্মীয়দের মাঝে কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। তিনি জানান, কবির চৌধুরীর দুই ভাইসহ তার পুরো একটি মহল্লাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে কার্ড দেওয়া হয়েছে। এ অনিয়মের কারণে এলাকায় তীব্র গণক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

তালিকায় প্রকৃত কৃষকদের বাদ পড়ার বিষয়ে হতাশা ব্যক্ত করে সুয়াইর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. রুবেল মিয়া জানান, তার নিজ গ্রাম ৮নং ওয়ার্ডের কামারগাঁওয়ে ৪০ থেকে ৫০ জন কৃষক অতিবৃষ্টিতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চূড়ান্ত তালিকায় ওই গ্রামের কৃষকদের নামও স্থান পায়নি।

তবে, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সুয়াইর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এটিএম মোস্তফা জামিল স্বপন। তিনি জানান, ঈদের পর থেকেই তিনি হারভেস্টার মেশিন নিয়ে টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জে অবস্থান করছেন। প্রাথমিক বা চূড়ান্ত কোনো তালিকাতেই তার স্বাক্ষর নেই। তালিকা প্রণয়নের মূল দায়িত্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি করে তিনি বলেন, এর দায়ভার কোনোভাবেই তার বা দলের নয়।

একইভাবে কৃষি প্রণোদনা কার্ড বিতরণে নিজের জড়িত থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন উপজেলা বিএনপি’র ১নং যুগ্ম-সম্পাদক কবির চৌধুরী। তবে প্রথমে তিনি নিজেকে গণমাধ্যমকর্মী দাবি করেন। তিনি জানান, কার্ড বিতরণের মূল তালিকা তৈরি বা বিতরণের কোনো কমিটিতেই তিনি অন্তর্ভুক্ত নন এবং এর সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার ভাষ্যমতে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কার্ড বিতরণের অলিখিত ও লিখিত মূল দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান (প্যানেল চেয়ারম্যান সোহেল), ইউএনও ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে সুইয়ার ইউপি’র প্যানেল চেয়ারম্যান সোহেল জানান, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী তালিকা পাঠানো হলেও ঢাকা থেকে মাত্র ৫৬৮টি কার্ড অনুমোদন পাওয়ায় ৫১৭ জন কৃষক বাদ পড়েছেন। তালিকা প্রণয়নের মূল দায়িত্ব কৃষি অফিস এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কমিটির ছিল দাবি করে তিনি বলেন, কামারগাঁও পাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষকদের বিষয়টি তদন্ত করে বরাদ্দ দেওয়া হবে। বর্তমানে অনিয়মের অভিযোগে কিছু কার্ডের বিতরণ স্থগিত রয়েছে।

মোহনগঞ্জ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুশ শাকুর সাদী জানান, তালিকাটি মূলত ইউনিয়ন কমিটি তৈরি করে জমা দিয়েছে। যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সার্বিক বিষয়ে মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন বলেন, নির্ধারিত ইউনিয়ন কমিটির মাধ্যমেই তালিকাটি প্রস্তুত করা হয়েছিল। তবে মৃত ব্যক্তি, চাকরিজীবী বা একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম থাকার মতো গুরুতর অভিযোগ ইতিমধ্যে প্রশাসনের নজরে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে বর্তমানে প্রশ্নবিদ্ধ নামগুলোর বিপরীতে সহায়তা বিতরণ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছে। তদন্ত করে প্রমাণিত হলে তালিকায় থাকা ভুয়া কৃষকদের নাম বাতিল করা হবে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : বেনাপোল কাস্টম হাউসে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের নামে কোটি টাকার পণ্য পাচার

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন