কুলাউড়ায় যেন চোরদের জন্য রাত এখন নিরাপদ, আর সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কের। এক মাসেরও কম সময়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৫টি গরু, ২টি সিএনজি অটোরিকশা এবং একাধিক বসতবাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনায় এখনো নেই দৃশ্যমান উদ্ধার অভিযান কিংবা অপরাধীদের গ্রেপ্তারের খবর। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনী কি সত্যিই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে আছে?
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় গত জুন থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ধারাবাহিক চুরির ঘটনায় জনমনে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সংঘটিত এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ চোরচক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
ঘটনাগুলোর মধ্যে ৮ই জুন উপজেলার সদর ইউনিয়ন এর লস্করপুর এলাকায় রিয়াজ মিয়ার গোয়ালঘর থেকে গভীর রাতে ২টি গাভি ও ২টি ষাঁড় চুরি হয়।
৯ই জুন রাউৎগাঁও ইউনিয়নের রাউৎগাঁও গ্রামের মাহবুব মিয়ার বাড়ি থেকে মৌলভীবাজার-থ ১২-৫২২০ নম্বরের একটি সিএনজি অটোরিকশা চুরি হয়। একই রাতে উছলাপাড়া গ্রামের কানাডা কুলাউড়া সমিতির সভাপতি মুহিবুর রহমান খান মুয়ুবের বাসায় চোরেরা ঢুকে স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও অন্যান্য মূল্যবান মালামাল নিয়ে যায়।
হাজিপুর ইউনিয়নের বারইগ্রামে জহুর আলীর গোয়ালঘরের তালা কেটে ৪টি গরু চুরি করা হয়। এর মধ্যে ছিল একটি শাহিওয়াল জাতের বাছুর, একটি লাল গাভি, একটি হালকা লাল রঙের গাভিন গাভি এবং একটি কালো গাভি।
১৫ জুন কর্মধা ইউনিয়নের পুরশাই বেরী গ্রামে মো. রফিক মিয়ার গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ৪টি গরু চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
১৯ জুন কুলাউড়া সরকারি হাসপাতালের সামনে থেকে রাত প্রায় ১১টার দিকে মৌলভীবাজার-থ ১৩-০৫৩৯ নম্বরের একটি সিএনজি অটোরিকশা চুরি হয়। সিএনজিটির মালিক হিংগাজিয়া চা-বাগান এলাকার মো. সাহেল আহমদ।
২৩ জুন রাউৎগাঁও ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে মাসুক মিয়ার গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ২টি গরু চুরি করা হয়। একই দিনে ভূকশিমইল ইউনিয়নের জলালপুর গ্রামে মো. মশাহিদ আহমদের গোয়ালঘর থেকে ২টি গাভি ও ১টি বাছুরসহ মোট ৩টি গরু চুরি হয়।
এছাড়া ৫ জুলাই কুলাউড়া শহরের হেলাল মঞ্জিলে এক ভাড়াটিয়ার বাসায় চুরির ঘটনা ঘটে। ৬ জুলাই টিবিএফ চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম শামীমের বাসায় চোরেরা প্রবেশ করে একটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায়।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এভাবে একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটলেও যদি চোরদের শনাক্ত করা না যায় বা চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কার কাছে নিরাপত্তা চাইবে? রাত হলেই এখন মানুষ আতঙ্কে থাকে। গরুর খামার, সিএনজি, এমনকি ঘরবাড়িও নিরাপদ নয়। পুলিশের নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, “এগুলোর তথ্য আমার কাছে নেই।”
অন্যদিকে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, তিনি সম্প্রতি জেলায় যোগদান করেছেন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় বিষয়টি তার নজরে আসেনি। তিনি কুলাউড়ার ঘটনাগুলো গুরুত্বসহকারে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান।
বাংলাদেশ পুলিশের দায়িত্ব সম্পর্কে পুলিশ আইন, ১৮৬১ এবং Code of Criminal Procedure (CrPC) অনুযায়ী, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ প্রতিরোধ, সংঘটিত অপরাধের কার্যকর তদন্ত এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা পুলিশের মৌলিক দায়িত্ব। একইভাবে দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী চুরি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অপরাধ ঘটতে থাকলে তা প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল বৃদ্ধি এবং দ্রুত তদন্তের কার্যকারিতা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়।
কুলাউড়ায় একের পর এক চুরির ঘটনায় সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে। কেবল আশ্বাস নয়, এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান অভিযান, চোরচক্র শনাক্ত, চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা। অন্যথায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, পুলিশের পক্ষ থেকে কথার চেয়ে কাজে কত দ্রুত পরিবর্তন আসে।
পড়ুন : সৈয়দপুরে শ্রমিক নির্যাতন ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ করে মানবন্ধন


