বিকেলের রোদ তখনও পুরোপুরি ম্লান হয়নি। মেঠোপথ ধরে ছোট্ট একটি সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এক শিশু। সাইকেলের পেছনে বাঁধা বাদামের প্যাকেট, গায়ে স্কুলের পোশাক। বয়স সাত-আট বছরের বেশি নয়। তার নাম মাহিম। দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর কাছে বিকেল মানেই খেলাধুলা নয়, বরং জীবিকার সংগ্রাম।
স্কুল ছুটি শেষে যখন সমবয়সীরা মাঠে ছুটে যায়, মাহিম তখন সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে পাড়া-মহল্লায়। ছোট্ট কণ্ঠে ডেকে ডেকে বিক্রি করে বাদাম। শৈশবের খেলাধুলার জায়গা দখল করে নিয়েছে সংসারের দায়। মাহিম মেহেরপুর সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের গ্যাজালপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল মান্নানের ছেলে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর আগে পানিতে ডুবে মারা যায় মাহিমের এক ভাই। এরপর দেড় বছর আগে স্ট্রোকে মারা যান তার বাবা। এর আগেই বিয়ে হয়ে যায় বড় বোনের। বর্তমানে পরিবারে রয়েছেন শুধু মাহিম ও তার মা শিল্পী খাতুন। সংসারের খরচ চালানোর দায়িত্ব এসে পড়ে ছোট্ট ছেলেটির কাঁধে।
প্রতিদিন ভোরে মাহিমের মা শিল্পী খাতুন প্রায় ৫০টি বাদামের প্যাকেট তৈরি করেন। এরপর মাহিম স্কুলের পোশাক পরে, খাবার খেয়ে সেগুলো সাইকেলে বেঁধে স্কুলে যায়। ক্লাস শেষে বাড়ি না ফিরে শুরু হয় বাদাম বিক্রির কাজ।
রোদ কিংবা বৃষ্টি—কোনো কিছুই তার পথচলা থামাতে পারে না। আর এ সময় বাড়িতে বসে ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন তার মা। প্রতিদিন নিরাপদে ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গোনেন তিনি।
শিল্পী খাতুন বলেন, যে বয়সে তার ছেলে লেখাপড়া করবে এবং বন্ধুদের সঙ্গে খেলবে, সেই বয়সে তাকে সংসারের জন্য বাদাম বিক্রি করতে হচ্ছে। একজন মা হিসেবে এটি তার জন্য অত্যন্ত কষ্টের। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত তারা সরকারি কোনো সহায়তা পাননি। কিছুদিন আগে বৃষ্টিতে ভিজে বাদাম বিক্রি করতে গিয়ে মাহিম অসুস্থ হয়ে পড়লেও সংসারের প্রয়োজনেই আবার কাজে বের হতে হয়েছে।
অভাবের মধ্যেও পড়াশোনা ছাড়েনি মাহিম। ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মাহিমকে বই, খাতা ও কলম দেওয়া হয়েছে, যাতে আর্থিক সংকটের কারণে তার শিক্ষা ব্যাহত না হয়। স্থানীয়রাও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
মেহেরপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, আগামী আগস্টের শেষ নাগাদ মাহিমের মায়ের জন্য বিধবা ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ইউনিসেফের সহায়তায় ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জন্য যে শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচি রয়েছে, সেখানে মাহিমকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া সমাজসেবা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে অন্যান্য সম্ভাব্য সহায়তাও দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
দিন শেষে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরে মাহিম। বইয়ের ব্যাগের পাশেই থেকে যায় কয়েকটি অবিক্রিত বাদামের প্যাকেট। এক হাতে বই, অন্য হাতে বাদামের ঝুড়ি—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রেখেই এগিয়ে চলছে তার জীবনসংগ্রাম। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, একটি শিশুর কাঁধে সংসারের এমন ভার আর কতদিন থাকবে? সামান্য সহযোগিতাই কি ফিরিয়ে দিতে পারে না তার হারিয়ে যাওয়া শৈশব?
পড়ুন: বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ইয়ামালের প্রশংসায় মেসি
আর/


