মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নানা সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষক সংকট, যাতায়াতের দুর্ভোগ, আবাসন সংকট, নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, মোবাইল নেটওয়ার্কের দুরবস্থা এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে এসব বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা থাকলেও তা সমাধানে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হরিরামপুর উপজেলার পদ্মা নদীবেষ্টিত আজিমনগর, লেছড়াগঞ্জ ও সুতালড়ি ইউনিয়নকে দুর্গম চরাঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই তিন ইউনিয়নে মোট ১৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে সুতালড়ি রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বর্তমানে নেই বলে জানা গেছে। বাকি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও রয়েছে শিক্ষক সংকট। আটটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। পাশাপাশি ১০টি বিদ্যালয়ে একাধিক সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুর্গম চরাঞ্চলের এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে যাতায়াতের বড় সমস্যা। পদ্মা নদীর ভাঙন ও নৌপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষককে প্রতিদিন সমতল এলাকা থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌযানে নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। নৌযান সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং কখনো কখনো নৌযান মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চরাঞ্চলের অনেক বিদ্যালয়ে যেতে শিক্ষকদের ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। যাতায়াতের মাধ্যম ও সড়কের অবস্থার কারণে একদিকে যেতে সময় লাগে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। আবার একই সময় ব্যয় হয় ফেরার পথে। ফলে প্রতিদিন একজন শিক্ষককে প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা শুধু যাতায়াতেই ব্যয় করতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের বড় একটি অংশ যাতায়াতেই চলে যায়।
এতে শিক্ষকদের সময় ও অর্থ—দুইয়ের ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক শিক্ষককে প্রতিদিন কয়েকশ টাকা পর্যন্ত যাতায়াত খরচ করতে হয়। মাস শেষে বেতনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ যাতায়াত ব্যয়েই চলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক।
পাঠানকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, “প্রতিদিন যাতায়াতেই আমার প্রায় তিন ঘণ্টা চলে যায়। প্রতিদিন খরচ হয় প্রায় ৩০০ টাকা। বেতনের বড় একটি অংশ যাতায়াতেই চলে যায়। আজিমনগর, হারুকান্দি ও লেছড়াগঞ্জ চরে যারা শিক্ষকতা করেন, তাদের যাতায়াতব্যবস্থা আরও কঠিন। বর্ষার সময় পরিস্থিতি খুবই খারাপ হয়। অনেক কষ্ট করে বাধ্য হয়ে আমাদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়।”
এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরমান আলী বলেন, “যাতায়াতে প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা সময় চলে যায়। খরচ হয় প্রায় ৩০০ টাকা। বর্ষার সময় সময় ও খরচ দুটোই আরও বেড়ে যায়। কিন্তু এ জন্য আমাদের কোনো ভাতা নেই।”
শিক্ষকদের অভিযোগ, চরাঞ্চলে কাজ করার জন্য কোনো ধরনের বিশেষ যাতায়াত সুবিধা কিংবা দুর্গম এলাকার ভাতা না থাকায় তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় নৌপথ ও দুর্গম সড়ক পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে গিয়ে শারীরিকভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয়।
শুধু শিক্ষক সংকট কিংবা যাতায়াত সমস্যাই নয়, চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও দিনমজুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরিবারের আয়ের সঙ্গে শিশুদের কাজের সম্পর্ক থাকায় অনেক অভিভাবক সন্তানের নিয়মিত লেখাপড়ার চেয়ে পারিবারিক ও কৃষিকাজকে বেশি গুরুত্ব দেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এনায়েতপুর, আজিমনগর ও পূর্ব আজিমনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও অনেক সময় উপস্থিতির হার তুলনামূলকভাবে কম থাকে। অন্য বিদ্যালয়গুলোর কোনো কোনোটিতে ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী থাকলেও নিয়মিত উপস্থিত থাকে ১৫ থেকে ২০ জনের মতো। ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা কাগজে-কলমে বেশি হলেও বাস্তবে নিয়মিত পাঠদানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম।
স্থানীয়দের মতে, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাই মূলত এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। নদীভাঙন, জীবিকার অনিশ্চয়তা, কৃষিকাজ, নৌপথনির্ভর যোগাযোগ এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিতে পারে না।
এদিকে চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত শিক্ষকদের আবাসন সংকটও প্রকট। অনেক বিদ্যালয়ের আশপাশে ভাড়া বাসা পাওয়া যায় না। ফলে দূরবর্তী এলাকা থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করেই দায়িত্ব পালন করতে হয় শিক্ষকদের। এতে সময় ও অর্থের পাশাপাশি তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপও বাড়ছে। নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের সংকট আরও বেশি সমস্যার সৃষ্টি করে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মোবাইল নেটওয়ার্কের দুরবস্থা। চরাঞ্চলের অনেক এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকায় শিক্ষকদের সঙ্গে পরিবার কিংবা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগও অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে শিক্ষক ও তাদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
নদীভাঙন ও বন্যার সময় এসব সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করে। স্বাভাবিক সময়ে যে পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব, বর্ষা বা বন্যার সময় সেই পথ হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। নৌযান নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় যাতায়াত খরচও বাড়ে। অনেক সময় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষকরা প্রশাসনিক জটিলতার মুখেও পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরেকটি সমস্যা হলো বদলি ব্যবস্থা। চরাঞ্চলের কোনো কোনো বিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক দীর্ঘদিন একই বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকছেন। বদলির বিভিন্ন নিয়ম ও প্রক্রিয়ার কারণে অনেক শিক্ষক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অন্যত্র বদলি হতে পারছেন না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। ফলে দুর্গম এলাকায় দীর্ঘদিন কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
চরাঞ্চলের শিক্ষা কার্যক্রমের এই সংকটকে শুধু শিক্ষক সংকট দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়নের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা, আবাসন, যাতায়াত ভাতা, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
হরিরামপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাজী সাইফুল ইসলাম বলেন, “চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা দরকার। এ বিষয়ে পরিকল্পনার প্রস্তাবনা প্রায় ছয় মাস আগে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে পদায়নের ক্ষেত্রে পুরুষ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দিলে অনেকটা সুফল পাওয়া যেতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবনা অনুমোদন হলে চরাঞ্চলের শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছি।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত পদশূন্য পূরণ, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াতব্যবস্থা, শিক্ষকদের জন্য আবাসন সুবিধা এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি চরাঞ্চলের অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
চরাঞ্চলের মানুষের অভিযোগ ও শিক্ষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, দুর্গম এলাকার শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা নতুন ভবন নির্মাণের মাধ্যমে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা কঠিন। তাই স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মূলধারার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করার উদ্যোগই এখন সবচেয়ে জরুরি।
পড়ুন : রেডিও কলোনিতে পার্কিং করা বাসে আগুন, পালিয়ে গেল দুর্বৃত্তরা


