জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসার পরদিনই রাজধানীর বাজারে তার প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে। পরিবহণ ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে বাজারে আসা বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করেছে। একদিকে নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, অন্যদিকে বাসভাড়া বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে আয় না বাড়লেও দৈনন্দিন খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র একদিনের ব্যবধানেই বেগুন, শসা, কাঁচামরিচ, ডিম, রসুন, আটা-ময়দা ও ভোজ্যতেলসহ অন্তত ১০টি পণ্যের দামে পরিবর্তন এসেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহণ ব্যয়ের বাড়তি চাপ। ফলে বাজারে পণ্য পৌঁছানোর খরচ থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের বোঝা গিয়ে পড়ছে ক্রেতার ওপর।
এর আগে সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। সেই ঘোষণার পরদিন মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব ইতোমধ্যে পণ্যের দামে পড়তে শুরু করেছে।
বাজারের এই পরিবর্তনের পেছনে পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধিকেই কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, নতুন করে যেসব পণ্য বাজারে আসছে, সেগুলো পরিবহণে আগের চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে। আর সেই বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করতে গিয়ে পণ্যের দামও বাড়ছে।
রাজধানীর বাজারে এদিন আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ১৩০ টাকায়। দুদিন আগেও এর দাম ছিল ৮০ থেকে ১২০ টাকা। শসার দামও বেড়েছে। আগের দিন যেখানে সর্বনিম্ন ৪০ টাকা ছিল, সেখানে মঙ্গলবার বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৮০ টাকা দরে।
একইভাবে কাঁচামরিচের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০ থেকে ১৬০ টাকা। দুই দিন আগে ফার্মের ডিমের প্রতি হালি ৫০ টাকা থাকলেও এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়।
শুধু এসব পণ্যে নয়, অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারেও বাড়তি দামের চিত্র দেখা গেছে। তেজপাতা প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, আমদানি করা রসুন ১৮০ টাকা, বড় দানার মসুর ডাল ৯৫ থেকে ১০০ টাকা, খোলা আটা ৫০ টাকা, খোলা ময়দা ৭০ টাকা এবং খোলা পামওয়েল লিটারপ্রতি ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের কয়েকটির দাম আগের তুলনায় ইতোমধ্যে বেড়েছে।
নয়াবাজারের এক মুদি ব্যবসায়ী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহণ ভাড়া বেড়েছে। তাই নতুন করে যেসব পণ্য আনা হচ্ছে, সেগুলোর দাম বাড়ছে। তবে আগে কেনা পণ্যের দাম এখনো অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত রয়েছে।
অর্থাৎ জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম বাজারে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যাচ্ছে নতুন করে বাজারে আসা পণ্যের দামে। আগে কেনা পণ্যের ক্ষেত্রে যেখানে দাম অপরিবর্তিত থাকার কথা জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা, সেখানে নতুন চালানে পরিবহণ ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে বলে তাদের বক্তব্য।
পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি উঠে এসেছে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতির বক্তব্যে। ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির জানান, জ্বালানির দাম বাড়ায় দূরপাল্লার পণ্য পরিবহণে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। বগুড়া থেকে ঢাকায় একটি ট্রাকের ভাড়া আগে ১৮-২০ হাজার টাকা থাকলেও এখন আরও ২-৩ হাজার টাকা বেশি নিতে হচ্ছে।
পরিবহণ ব্যয়ের এই বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকছে, তার উত্তর মিলছে বাজারে আসা পণ্যের দামে এবং ক্রেতাদের পারিবারিক হিসাবের মধ্যে। নয়াবাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সোহাগ জানান, ৪২ হাজার টাকা বেতনে পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে গিয়ে এমনিতেই মাসের শেষ দিকে হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খাবারসহ অন্যান্য পণ্যের দাম আরও বাড়লে ঋণের বোঝা বাড়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
ভোক্তা পর্যায়ে বাড়তি ব্যয়ের এই চাপের বিষয়টি তুলে ধরেছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু পরিবহণেই সীমাবদ্ধ থাকে না; উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য খাতের ব্যয়ও বাড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ ভোক্তার ওপরই পড়ে।
অন্যদিকে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে সরকার। তবে জ্বালানি ব্যয়ের বাড়তি চাপ কতটা দ্রুত অন্যান্য পণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, সেটিই এখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর মধ্যেই আজ থেকে বাড়ানো হয়েছে বাসের ভাড়াও। বাসভাড়া বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের খরচের ওপরও নতুন করে চাপ তৈরি হবে। বাড়তি এই ভাড়ার প্রভাব সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষকেও চাপে ফেলবে।
পড়ুন: বাসভাড়া বাড়ল প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা
আর/


