শ্বাসপ্রশ্বাস ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে শরীরের কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বের করে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে ফুসফুস। কিন্তু বড় কোনো সমস্যা দেখা না দেওয়া পর্যন্ত শরীরের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির যত্ন নেওয়ার বিষয়টি অনেকেরই নজরের বাইরে থাকে।
বায়ুদূষণ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং বিভিন্ন রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকার কারণে হাঁপানি, সিওপিডি ও ফুসফুসের ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তবে দৈনন্দিন জীবনে কিছু ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তুলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ভালো রাখা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার পাশাপাশি জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে ফুসফুস সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শ্বাস নেওয়া ও বসার ভঙ্গিতে নজর দিন
ভালো রাখার সহজ উপায়গুলোর একটি হলো শ্বাস নেওয়ার ধরন ও বসার ভঙ্গি ঠিক রাখা। শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিকভাবেই ঘটে, তবে অনেকেই বুক দিয়ে অগভীরভাবে শ্বাস নেন। এতে ফুসফুসের পুরো ধারণক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।
চিকিৎসকদের মতে, পেট ফুলিয়ে গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস বা ‘ডায়াফ্রাগমেটিক ব্রিদিং’ ফুসফুসের পেশিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্ট্যামিনা বাড়াতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে সঠিক শারীরিক ভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ। কুঁজো হয়ে কিংবা পিঠ বাঁকিয়ে বসলে ফুসফুস সংকুচিত হতে পারে এবং শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন প্রবেশে বাধা তৈরি হতে পারে।
তাই সোজা হয়ে বসার পাশাপাশি নিয়মিত স্ট্রেচিং ও যোগব্যায়ামের মতো অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। এসব অভ্যাস বুকে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের সুযোগ তৈরি করে।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
ফুসফুস সচল ও সতেজ রাখতে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, সুস্থ ফুসফুসের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট ব্যায়াম করা প্রয়োজন। দ্রুত হাঁটা, সাঁতার বা সাইকেল চালানোর মতো কার্ডিও ব্যায়াম রক্ত চলাচল বাড়ায় এবং ফুসফুসকে কার্যকরভাবে অক্সিজেন সরবরাহে সহায়তা করে।
কোর মাসল বা পেটের পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়ামও ডায়াফ্রামকে সহায়তা করে। এতে শ্বাস নেওয়া সহজ হয়। পাশাপাশি মন খুলে হাসা কিংবা গান গাওয়ার মতো আনন্দদায়ক কাজও ফুসফুসের জন্য উপকারী ব্যায়াম হিসেবে কাজ করে। এগুলো ফুসফুসের স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে এবং ভেতরে জমে থাকা পুরোনো বা দূষিত বাতাস বের করে দিতে সহায়তা করে।
ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখুন
ফুসফুসের স্বাস্থ্যের ওপর চারপাশের বাতাসের মান সরাসরি প্রভাব ফেলে। অনেক সময় বাইরের তুলনায় ঘরের ভেতরের বাতাসও বেশি দূষিত হতে পারে। ঘরে জমে থাকা ধুলো, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে তৈরি ছত্রাক, পোষা প্রাণীর লোম এবং রাসায়নিক পরিষ্কারক ব্যবহারের কারণে ধীরে ধীরে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে ঘরের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। ক্ষতিকর রাসায়নিকের পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে ঘর পরিষ্কার করা এবং সম্ভব হলে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ ছাড়া বাইরের বাতাসের মান খুব খারাপ থাকলে অতিরিক্ত ধুলাবালি ও যানজটপূর্ণ এলাকায় হাঁটা কিংবা ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো।
ধূমপান থেকে দূরে থাকুন
ফুসফুস সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে ধূমপান এড়িয়ে চলা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিগারেটের ধোঁয়া ফুসফুসের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি শ্বাসনালী সংকুচিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে পরবর্তীতে ক্যানসারের মতো গুরুতর রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পরোক্ষ ধূমপানও ক্ষতিকর।
তবে ধূমপান ছেড়ে দিলে শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কার্যক্ষমতার দিকে ফিরতে শুরু করে। ধূমপান ছাড়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ফিরে পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ফুসফুসের বিভিন্ন রোগের লক্ষণ অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকাশ পায় না। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা চেকআপ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সমস্যা শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে তা সহজে নিরাময় করা সম্ভব হয়।
খাবারে বৈচিত্র্য রাখুন
ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত পানি পানও গুরুত্বপূর্ণ। শরীরকে আর্দ্র রাখতে প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি পান করা জরুরি। ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্যও পর্যাপ্ত আর্দ্রতা প্রয়োজন। শরীরে পানির ঘাটতি হলে ফুসফুসের মিউকাস বা শ্লেষ্মা ঘন হয়ে যেতে পারে। এতে ক্ষতিকর পদার্থ সহজে ফুসফুস থেকে বের হতে বাধাগ্রস্ত হয়।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবারও ফুসফুসের সুরক্ষায় সহায়ক। সামুদ্রিক মাছ, সাইট্রাসজাতীয় ফল, সবুজ শাকসবজি, বাদাম এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবার ফুসফুসের টিস্যুর প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো শ্বাসতন্ত্রে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
ফুসফুস সুস্থ রাখার বিষয়টি কোনো একদিনের উদ্যোগ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসের অংশ। গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং পরিষ্কার বাতাসের পরিবেশে থাকার মতো অভ্যাস ফুসফুসের জন্য সুরক্ষার ভূমিকা রাখতে পারে।
সচেতনতা ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে ফুসফুসকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি প্রাণবন্ত ও দীর্ঘায়ু জীবনের পথও সহজ হতে পারে। ফুসফুস সুস্থ থাকলে প্রতিটি শ্বাসই হয়ে উঠতে পারে আরও স্বস্তিদায়ক ও সতেজ।
পড়ুন : স্মৃতি হারানোর আগে সচেতন হোন: বাংলাদেশে ডিমেনশিয়া, নীরব এক স্বাস্থ্য সংকট
সা/


