তিন বাংলাদেশি ও এক ভারতীয় তরুণের তৈরি স্টার্টআপ জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা অ্যাকসেলারেটর এ একজন মানুষকে যদি বলা হয়, ইন্টারনেটে ঢুকে এই তথ্যটি খুঁজে বের করো, একটি ওয়েবসাইটে লগইন করো, একটি ফরম পূরণ করো, তারপর নিয়মিত ওই ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখো কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি-না একজন মানুষ হয়তো কাজটি করে ফেলবেন। কিন্তু একই কাজ যদি একসঙ্গে হাজার হাজার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এজেন্টকে করতে দেওয়া হয়, তখনই শুরু হয় সমস্যা। এই সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে এসেছেন চার বন্ধু—আরমান লুথরা, মো. শাহরিয়ার ইসলাম আরহাম, কাজী ফারদীনুল হক ও আবদুল বাসিত তন্ময়। তাঁদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি এবং একজন ভারতীয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট লিবারেল আর্টস কলেজ-এ পড়ার সময় তাঁদের বন্ধুত্ব। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল একসঙ্গে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার যাত্রা। আজ তাঁদের তৈরি স্টার্টআপ জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্টার্টআপ অ্যাকসেলারেটর-এ।
চার বন্ধুর জন্য এটি শুধু একটি ব্যবসায়িক সাফল্য নয়; বরং ছোট একটি কলেজের ক্যাম্পাস থেকে বিশ্ব প্রযুক্তির কেন্দ্র সান ফ্রান্সিসকো পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প। এআই কেন সব কাজ করতে পারে না? এসব ব্যবস্থা স্প্যামার ও ক্ষতিকর বট ঠেকাতে কার্যকর। কিন্তু এর ফলে একজন বৈধ অও এজেন্টও কখনো কখনো বাধার মুখে পড়ে। ঞরষরড়হ-এর লক্ষ্য হলো অও এজেন্টকে এমন অবকাঠামো দেওয়া, যাতে তারা মানুষের মতো ওয়েব ব্রাউজারে কাজ করতে পারে।
চার বন্ধু, চার রকম প্রতিভা
গল্পকে শুধু একটি প্রযুক্তি কোম্পানির গল্প বললে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কারণ, এই চার তরুণের প্রত্যেকের নিজের জায়গায় রয়েছে অসাধারণ সাফল্যের গল্প।
আরমান লুথরা প্রযুক্তি ও শিল্প—দুই জগতেই আগ্রহী। কোডিংয়ের চেয়েও আগে তাঁর জীবনে এসেছে ছবি আঁকা। তাঁর আঁকা কিছু ছবি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে এবং পাঠ্যবইয়েও স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে তিনি রেমিট্যান্স-সংক্রান্ত এমন অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন, যেগুলো বিলিয়ন ডলারের সরকারি বাজেটের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। বায়োটেকনোলজি খাতে ডেটা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেও কাজ করেছেন। পরে ওয়াশিংটনের একটি থিংক ট্যাংকে জটিল ডেটা সমস্যা সমাধানের কাজ করেন।
মো. শাহরিয়ার ইসলাম আরহাম প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেছেন বাস্তব সমস্যার সমাধানে। তিনি এমন সফটওয়্যার তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে হাজার হাজার শিক্ষার্থী চাকরির সুযোগ পেয়েছেন। পরে ব্রাউজার অবকাঠামো নিয়ে কাজ করেছেন, যেখানে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো প্রযুক্তি তৈরি করেন—যখন তিনি নিজেই তখন কলেজের ছাত্র।
কাজী ফারদিনুল হক (ফারদিন)। তার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এমন প্রযুক্তি তৈরি করা, যাতে একটি কম্পিউটার একই সময়ে অল্প কয়েকটি নয়, শত শত অও মডেল পরিচালনা করতে পারে। উন্নত এআই মডেলকে বাস্তব ব্যবহারে নিয়ে আসার কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন। আর আবদুল বাসিত তন্ময় হ্যাকাথন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ও নিজস্ব প্রযুক্তি প্রকল্প নিয়ে কাজ করে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন হ্যাকাথনে সাফল্য পেয়েছেন। নিজস্ব এআই মডেলও তৈরি করেছেন, যেগুলো অন্যরা বিনা মূল্যে ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে নিজের একটি প্রযুক্তি ল্যাবও প্রতিষ্ঠা করেছেন। শুধু প্রযুক্তি নয়, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতাও চার বন্ধুর গল্পের আরেকটি দিকও রয়েছে।
আরমানের জীবনে প্রযুক্তির পাশাপাশি শিল্পের জায়গা রয়েছে। আরহাম যুক্তরাষ্ট্রেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত—নিজের বেড়ে ওঠার সংস্কৃতিকে নতুন পরিবেশে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। ফারদিন সুযোগ পেলেই ফুটবল খেলেন। তন্ময়ের আগ্রহ ফটোগ্রাফিতে—চারপাশের এমন অনেক মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখেন, যা হয়তো অন্যদের চোখ এড়িয়ে যায়। তাঁরা চারজন বন্ধু—যাঁদের বন্ধুত্বের ভিত্তি ছিল প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ, কিন্তু যাঁদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা প্রতিভা ও সৃজনশীলতার জগৎ।
ছোট কলেজের ডরমিটরি থেকে সান ফ্রান্সিসকো
যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোনো প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নয় এটি। সেখানকার একটি ডরমিটরি রুম থেকেই চার বন্ধুর উদ্যোগের শুরু। সেই ছোট্ট ঘরের আলোচনা ও পরীক্ষানিরীক্ষা এখন পৌঁছে গেছে সান ফ্রান্সিসকোর প্রযুক্তি জগতে। আধুনিক কর্মজীবনের বড় একটি অংশ এখনো এমন কাজে ব্যয় হয়, যা অত্যন্ত পুনরাবৃত্তিমূলক—এক ওয়েবসাইটে লগইন করা, এক ট্যাব থেকে অন্য ট্যাবে তথ্য কপি করা, একই ফরম বারবার পূরণ করা কিংবা কোনো ওয়েবসাইটে নতুন তথ্য এসেছে কি না তা নিয়মিত পরীক্ষা করা।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি বার্তা
এই গল্পের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী দিক সম্ভবত এখানেই। তিন বাংলাদেশি তরুণ—যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে গিয়ে এক বন্ধুত্বের সূত্রে একসঙ্গে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন—আজ বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা পেরিয়েছেন। তাঁরা কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি সাম্রাজ্য থেকে শুরু করেননি। শুরুটা হয়েছিল একটি ছোট কলেজের ডরমিটরি থেকে। আজ তাঁদের সামনে সিলিকন ভ্যালি। কিন্তু তাঁদের গল্পের প্রকৃত মূল্য হয়তো আরও বড়—এটি দেখায়, বাংলাদেশের তরুণদের মেধা, কৌতূহল ও সৃজনশীলতার সীমানা বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। একসময় মানুষের কাজ ছিল কম্পিউটারকে নির্দেশ দেওয়া। এখন অও-কে দিয়ে কাজ করানোর সময় এসেছে। আর সেই নতুন পৃথিবীতে ইন্টারনেটের সঙ্গে অও-এর যোগাযোগের সেতু তৈরি করতে চার বন্ধু কাজ করছেন। একটি ছোট কলেজের ডরমিটরি থেকে শুরু হওয়া সেই স্বপ্ন এখন বিশ্বমঞ্চে।
পড়ুন : ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ মেটার বিরুদ্ধে


