বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ময়লার ভাগাড় থেকে সবুজ সড়কের পথে বাংলাদেশ

ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ আমিনবাজার–হেমায়েতপুর সড়ক। দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কের দুই পাশে জমে থাকা বর্জ্য শুধু পথচারী ও যাত্রীদের দুর্ভোগই বাড়ায়নি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং রাজধানীর সৌন্দর্যের ওপরও ফেলেছে বিরূপ প্রভাব। প্রায় দুই দশক ধরে চলতে থাকা এই সমস্যার সমাধানে বর্জ্য অপসারণ ও সড়কের পাশের এলাকা পরিচ্ছন্ন করার যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে, তা জনস্বার্থে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

এই উদ্যোগের বাস্তবায়নে ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দীর্ঘদিনের বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের ভূমি উন্নয়ন, ঢাল সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং ভবিষ্যতে পুনরায় বর্জ্য ফেলা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা একটি সমন্বিত পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সমন্বয়ে এই কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গেলে আমিনবাজার–হেমায়েতপুর সড়ককে শুধু ময়লামুক্ত নয়, বরং একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও জনবান্ধব সড়কে রূপান্তর করা সম্ভব। দীর্ঘদিনের একটি দৃশ্যমান সমস্যা সমাধানে এই উদ্যোগ তাই ভবিষ্যৎ নগর ও মহাসড়কভিত্তিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি সড়কটির পাশে দীর্ঘদিনের বর্জ্য ও দুর্গন্ধের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের বর্জ্য অপসারণ, নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর, রাস্তার পাশের ভূমি উন্নয়ন, ঢাল সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং ভবিষ্যতে সেখানে বর্জ্য ফেলা বন্ধে বেড়া নির্মাণের কার্যক্রম শেষ হয়েছে।

বর্জ্য সরিয়ে ফেলাই সমস্যার সমাধান নয়; বর্জ্য যাতে আবার সেখানে ফিরে না আসে, সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। অতীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য অপসারণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই একই স্থানে আবার বর্জ্য জমতে দেখা গেছে। তাই আমিনবাজার–হেমায়েতপুরের ক্ষেত্রে সাময়িক পরিচ্ছন্নতার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।

বর্জ্যের স্তূপ থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায়, মশা-মাছি ও অন্যান্য রোগবাহক প্রাণীর বিস্তার ঘটে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্যের দূষিত উপাদান আশপাশের মাটি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্লাস্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল উপাদান দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে মাটি, পানি ও প্রতিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে মহাসড়কের পাশে দীর্ঘস্থায়ী বর্জ্যের সমস্যা কেবল সৌন্দর্যহানির বিষয় নয়; এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি পানি জমে থাকার স্থানগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থলও কমানো সম্ভব। অর্থাৎ পরিচ্ছন্ন সড়ক, নিরাপদ পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রোগ প্রতিরোধ এসবকে আলাদা আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সড়কের দুই পাশে তাল, নিম, সুপারি, নারকেলসহ বিভিন্ন উপযোগী গাছ লাগানোর পরিকল্পনা প্রশংসনীয়। তবে বৃক্ষরোপণ মানে শুধু গাছ লাগানো নয়। কোন প্রজাতির গাছ কোথায় লাগানো হবে, গাছগুলোর মধ্যে কতটুকু দূরত্ব থাকবে, মাটির ধরন কেমন, শিকড় সড়কের ক্ষতি করবে কি না এবং গাছ লাগানোর পর কীভাবে পরিচর্যা করা হবে—এসব বিষয়ও পরিকল্পনায় রাখতে হবে। গাছ লাগানোর পর তার বেঁচে থাকার হারও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করা গেলে আমিনবাজার–হেমায়েতপুর সড়ক ভবিষ্যতে একটি পরিচ্ছন্ন, ছায়াময় ও সবুজ সড়কের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

আমিনবাজারকে শুধু ময়লামুক্ত করার মধ্যেই উদ্যোগটি সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। বরং এটিকে বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির একটি বাস্তব মডেলে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন বর্জ্য পৃথকীকরণ। জৈব বর্জ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য এবং অবশিষ্ট বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করতে হবে। বাজার, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকেই এই পৃথকীকরণ শুরু করা যেতে পারে। আলাদা বর্জ্যের জন্য আলাদা পাত্র, নির্দিষ্ট সংগ্রহসূচি এবং সুশৃঙ্খল পরিবহনব্যবস্থা চালু করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরবর্তী ধাপগুলো অনেক সহজ হবে।

জৈব বর্জ্য থেকে তৈরি করা যেতে পারে জৈব সার। খাদ্যবর্জ্য, বাজারের সবজির অবশিষ্টাংশ, পাতা ও অন্যান্য উপযোগী জৈব উপাদান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করে উন্নতমানের জৈব সার উৎপাদন সম্ভব। এ সার সড়কের পাশের সবুজায়ন, নার্সারি এবং আশপাশের কৃষিজমিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া জৈব বর্জ্য থেকে নিয়ন্ত্রিত তাপীয় প্রক্রিয়ায় বায়োচারে রূপান্তর করা যেতে পারে। বায়োচার মাটির গুণমান উন্নয়ন, জৈব উপাদান সংরক্ষণ এবং কার্বন ধরে রাখার ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য।

একটি সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সম্পদে রূপান্তরের কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে বর্জ্য গ্রহণ, বাছাই, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পৃথকীকরণ, জৈব বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরি, উপযুক্ত বর্জ্য থেকে বায়োচার উৎপাদন এবং অবশিষ্ট বর্জ্যের নিরাপদ নিষ্পত্তিসহ কার্যক্রম একটি ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে পারে। বর্জ্য সংগ্রহের গাড়ির চলাচল, বর্জ্যের পরিমাণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানের পরিমাণ, জৈব সার ও বায়োচার উৎপাদন এবং অবশিষ্ট বর্জ্যের পরিমাণ নিয়মিত নথিভুক্ত করা হলে পুরো ব্যবস্থার ওপর কার্যকর নজরদারি সম্ভব হবে। এতে শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নয়, পরিবেশের ওপর এর প্রভাবও পর্যবেক্ষণ করা যাবে। বর্জ্য কমানো, সম্পদ পুনরুদ্ধার, বৃক্ষরোপণ, কার্বন সংরক্ষণ এবং জনস্বাস্থ্য—সবগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা গেলে এর সঙ্গে স্থানীয় কর্মসংস্থানেরও নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বর্জ্য সংগ্রহ ও পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান বাছাই, জৈব সার ও বায়োচার উৎপাদন, পরিবহন, যন্ত্রপাতি পরিচালনা, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ প্রতিটি পর্যায়েই মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিকভাবে বর্জ্য সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে তাদের কাজের পরিবেশ আরও নিরাপদ হবে, অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ সঠিক পরিকল্পনা করা গেলে এই উদ্যোগ একই সঙ্গে বর্জ্য কমাবে, সম্পদ তৈরি করবে, পরিবেশের ওপর চাপ কমাবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

বর্তমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় দুর্বলতা হলো বর্জ্যকে যত দ্রুত সম্ভব অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলাকেই সমাধান হিসেবে দেখা। অথচ প্রকৃত সমাধান হলো বর্জ্যের উৎসেই পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান উদ্ধার, জৈব বর্জ্যকে জৈব সারে রূপান্তর এবং উপযুক্ত বর্জ্যকে বায়োচারে পরিণত করা। কেবল প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয় এমন অবশিষ্ট বর্জ্যই নির্ধারিত স্থানে নিরাপদভাবে নিষ্পত্তি করা উচিত। এই ব্যবস্থায় একটি ধারাবাহিক চক্র তৈরি হবে – বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, সম্পদ পুনরুদ্ধার, পুনর্ব্যবহার এবং পুনঃব্যবহার। ফলে ল্যান্ডফিলে পাঠাতে হবে এমন বর্জ্যের পরিমাণ কমবে এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক মূল্যসম্পন্ন উপাদান পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

সরকারি উদ্যোগ যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল ধরে রাখা কঠিন। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সড়ক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাসিন্দা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নিয়মিত তদারকি, পর্যাপ্ত বর্জ্য রাখার পাত্র, নির্দিষ্ট সংগ্রহব্যবস্থা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিষ্কার করা জায়গায় যেন আবার বর্জ্য ফেলা না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করা। আমিনবাজার–হেমায়েতপুরের বর্তমান উদ্যোগকে তাই কেবল একটি সড়কের বর্জ্য অপসারণ কর্মসূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি হতে পারে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য নগর ও মহাসড়কসংলগ্ন এলাকার জন্য একটি নতুন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মডেলের সূচনা।

প্রায় দুই দশকের দৃশ্যমান একটি সমস্যা দূর করার কাজ শুরু হয়েছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, উদ্যোগটি যেন সাময়িক পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার, জৈব সার উৎপাদন, বায়োচার তৈরি, বৃক্ষরোপণ, নিয়মিত তদারকি এবং জনসম্পৃক্ততার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

আমিনবাজারকে শুধু ময়লামুক্ত করা নয়, বর্জ্য থেকে সম্পদ, সম্পদ থেকে সবুজায়ন এবং সবুজায়ন থেকে সুস্থ পরিবেশ এই ধারাবাহিক ব্যবস্থার একটি দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে দীর্ঘদিনের একটি পরিবেশগত সমস্যাকেও ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় রূপান্তর করা যায়।

লেখক : অধ্যাপক ড. মোঃ সহিদুজ্জামান, ওয়ান হেলথ ও জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : স্মৃতি হারানোর আগে সচেতন হোন: বাংলাদেশে ডিমেনশিয়া, নীরব এক স্বাস্থ্য সংকট

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন