‘এই বিদ্যালয়ে কোনো প্রধান শিক্ষককে থাকতে দেওয়া হয় না’—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন ঢাকার ধামরাই উপজেলার পাঠানটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সামান্তা খান।
এক ভিডিও বক্তব্যে প্রধান শিক্ষিকা সামান্তা খান দাবি করেন, বিদ্যালয়ের কয়েকজন সহকারী শিক্ষক ও কর্মচারীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘সিন্ডিকেট’ সক্রিয় রয়েছে। তার অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটের প্রভাবেই অতীতে একাধিক প্রধান শিক্ষক নানা ধরনের হয়রানি ও অসহযোগিতার শিকার হয়েছেন।
সামান্তা খান বলেন, ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই তাকে বিভিন্ন ধরনের চাপ ও অসহযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তার দাবি, এর আগে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন প্রধান শিক্ষকও বিদ্যালয়ে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।
তিনি অভিযোগ করেন, একাধিক শিক্ষক তাকে সরাসরি বলেছেন—আগের একজন প্রধান শিক্ষিকাকেও তারা বিদ্যালয়ে থাকতে দেননি। এমনকি তার আগে বদলি হয়ে আসা একজন শিক্ষককে বিদ্যালয়ে যোগদান পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
‘দুই বছরেও এক পয়সা ফি নিইনি’
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকা সামান্তা খান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দুই বছর তিনি কোনো ফি নেননি। চলতি বছর প্রথমবার পরীক্ষার খরচ পরিচালনার জন্য ফি নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সম্মতিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০ টাকা এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৬০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
প্রধান শিক্ষিকার প্রশ্ন, সরকারি বরাদ্দের অর্থ হাতে না পেলে ৬২৮ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা ও বিদ্যালয়ের অন্যান্য কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করা হবে? তার দাবি, পরীক্ষার জন্য সরকারি বরাদ্দ হিসেবে ২২ হাজার ৫০০ টাকা থাকলেও তিনি সেই অর্থ এখনো তুলতে পারেননি।
কোচিং নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
বিদ্যালয়ে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন সামান্তা খান। তার দাবি, তিনি নিজে কোনো কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত নন। বরং বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে কোচিং পরিচালনা করে আসছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রধান শিক্ষিকার আরও দাবি, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তিনি অভিযোগ পেয়েছেন—কোচিংয়ে না গেলে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া কিংবা কম নম্বর দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।
একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগ পাওয়ার কথাও জানান তিনি।
‘পরীক্ষায় শূন্য, অথচ খাতায় ৯২-৯৭ শতাংশ নম্বর’
প্রধান শিক্ষিকার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি একটি শিক্ষার্থীর ফলাফল নিয়ে।
সামান্তা খান দাবি করেন, এক শিক্ষার্থীর মেধা ও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ১০ জন শিক্ষকের একটি প্যানেল দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। সেখানে ওই শিক্ষার্থী সন্তোষজনক ফল করতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি। অথচ আগের পরীক্ষার খাতায় ওই শিক্ষার্থীর নম্বর ছিল ৯২ থেকে ৯৭ শতাংশের মতো।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় বলে জানান প্রধান শিক্ষিকা।
তার দাবি, ওই শিক্ষার্থীকে বৃত্তির জন্য বিবেচনা করা হলে বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান।
শোকজের পরই ‘চাপ ও হুমকি’র অভিযোগ
সামান্তা খান অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে শোকজ করার পর স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তিকে ব্যবহার করে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। এমনকি তাকে হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাধ্যমেও বিভিন্ন সময়ে তাকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন প্রধান শিক্ষিকা।
তার ভাষ্য, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলেই একটি পক্ষ বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ পাঠিয়ে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
‘একদম ওয়েল-প্ল্যানড সিন্ডিকেট’
বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধান শিক্ষিকা সামান্তা খান বলেন, বিষয়গুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিকল্পিত গোষ্ঠী বিদ্যালয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করে আসছে।
তার ভাষায়, ‘তো মোটামুটি তাদের একটা সিন্ডিকেট। একদম পুরা ওয়েল-প্ল্যানড সিন্ডিকেট।’
তদন্ত কমিটির বক্তব্য
প্রধান শিক্ষিকার এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রমও চলছে বলে জানিয়েছেন ধামরাই উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা পলি রানী সরকার।
তিনি জানান, পাঠানটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তদন্ত কার্যক্রমে প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও অভিভাবক—সবার মতামত লিখিতভাবে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষককে নিজ নিজ মতামত লিখিতভাবে দিতে বলা হয়েছে।
পলি রানী সরকার বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনও লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হবে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় কাউকে কোনো ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
তার ভাষায়, “এখানে কাউকে কোনো ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়নি। আমি একজন কমিটির সদস্য হিসেবে বলছি।”
প্রধান শিক্ষিকার অভিযোগ ও তদন্ত কমিটির বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় এখন তদন্ত প্রতিবেদনে কী উঠে আসে, সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পড়ুন : রূপগঞ্জ ইউনিয়নের ভিংরাবোতে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আবু মাসুমের উঠান বৈঠক


