ব্যাংক খাতে আর্থিক সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। দেশের ৬৩টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি বর্তমানে পুঞ্জীভূত লোকসানে রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এসব ব্যাংকের মোট পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। একই সময়ে পুরো ব্যাংক খাতে পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৭৮৯ কোটি টাকা। তবে প্রভিশন, অন্যান্য ব্যয় ও সম্ভাব্য ঋণক্ষতি সমন্বয়ের পর ব্যাংক খাতে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।
রোববার জাতীয় সংসদে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যাংক খাতের এ চিত্র তুলে ধরা হয়। বৈঠকে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন কমিটির সদস্যরা। একই সঙ্গে পরবর্তী বৈঠকে ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে সুস্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত পুঞ্জীভূত লোকসানে থাকা ২২টি ব্যাংকের মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক, দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক, ১৫টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং একটি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। বিশেষায়িত ব্যাংক দুটি হলো বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)।
লোকসানে থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে এবি, বাংলাদেশ কমার্স, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, আইএফআইসি, ইসলামী, মেঘনা, ন্যাশনাল, গ্লোবাল ইসলামী, পদ্মা, সীমান্ত, সোশ্যাল ইসলামী, দ্য প্রিমিয়ার ও ইউনিয়ন ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান লোকসানে রয়েছে।
ব্যাংক খাতের আর্থিক সক্ষমতার দুর্বলতা শুধু লোকসানে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংক খাতে সম্পদের বিপরীতে উপার্জনের হার বা আরওএ ঋণাত্মক ১ দশমিক ০৩ শতাংশ। একইভাবে মূলধনের বিপরীতে উপার্জনের হার বা আরওই ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমেছে।
অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা সম্পদ ও মূলধন ব্যবহার করে পর্যাপ্ত আয় তৈরি হচ্ছে না। উচ্চ শ্রেণিকৃত ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন ঘাটতি এবং সম্পদের দুর্বল মানকে ব্যাংকগুলোর লোকসানের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ব্যাংকগুলো পরিচালন পর্যায়ে মুনাফা করলেও ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ, অন্যান্য ব্যয় এবং সম্ভাব্য ঋণক্ষতি সমন্বয়ের পর অনেক ব্যাংক নিট লোকসানে পড়ছে। ফলে পরিচালন মুনাফা থাকলেও প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার চিত্র অনেক ব্যাংকের ক্ষেত্রেই দুর্বল।
ব্যাংক খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো মূলধন সংকট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত তফসিলি ব্যাংকগুলোর মধ্যে মাত্র ৪০টি ব্যাংক ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে পেরেছে। বিপরীতে ১৫টি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।
এ সময়ে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার বা সিআরএআর ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ হার ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে মূলধন পর্যাপ্ততার হার আরও শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।
মূলধনের এই দুর্বলতা ব্যাংকগুলোর লোকসান মোকাবিলা, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং নতুন করে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠন ও পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগে ৩১ মার্চ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
মার্চ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়। তিন মাসে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।
তবে এক বছরের হিসাবে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাতে সামান্য উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। এক বছর পর তা কমে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ হয়েছে। তারপরও বিপুল পরিমাণ শ্রেণিকৃত ঋণ ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান ও ঋণ আদায়ের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
তারল্য সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছে। ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংককে ‘ল্যান্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে ডিমান্ড লোন দেওয়া হয়েছে ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পেয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এক্সিম ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ১০ হাজার ৮৪২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক পেয়েছে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংককে ৫ হাজার ৪২১ কোটি ১৬ লাখ, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংককে ৪ হাজার ৯০০ কোটি, এবি ব্যাংককে ৪ হাজার ২৭০ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে ৩ হাজার ৩ কোটি ৮০ লাখ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ৬১৪ কোটি ৬৮ লাখ, পদ্মা ব্যাংককে ২৫২ কোটি ৩৮ লাখ এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে ২৫১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিমান্ড লোন নবায়ন বা রোলওভারের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্ডারে সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। বর্তমানে সুদ পরিশোধের শর্তে এসব ঋণ রোলওভার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রচলিত ধারার ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও কিছু ব্যাংক এবং অধিকাংশ ইসলামী ধারার ব্যাংক তারল্য সংকটে রয়েছে। ব্যাংকগুলোর তরল সম্পদের বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তফসিলি ব্যাংকগুলোর আবশ্যকীয় নগদ জমা সংরক্ষণ বা সিআরআরের পরিমাণ ছিল ৬৯ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো নগদ জমা রেখেছিল ৮৯ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। একই সময়ে আবশ্যকীয় সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ বা এসএলআরের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা।
এদিকে খেলাপি ঋণ কমাতে ১০ শতাংশের বেশি শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে—এমন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ আদায়ের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কর্মপরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে জামায়াতের সাইফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকের সংখ্যা কমানো প্রয়োজন। তার ভাষ্য, দেশের অর্থনীতির তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি এবং ব্যাংক খাতে কাঠামোগত সংস্কার দরকার।
তিনি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে প্রচলিত অডিট ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ব্যাংক খাতে ফরেনসিক অডিটের দাবি জানান।
সাইফুল আলম বলেন, কোনো ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণ, আমানত ও মূলধনের অবস্থা জানতে ফরেনসিক অডিট প্রয়োজন। তার মতে, এ ধরনের নিরীক্ষার মাধ্যমে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক চিত্র স্পষ্ট করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, লোকসান, মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকট—চার দিক থেকেই চাপ বাড়ছে। সংসদীয় কমিটি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে।
পড়ুন:আগামী এক বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী
ইমি/


