বিমানবন্দর কার: সুবিধার নাকি যন্ত্রণার?

​ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। নামের সঙ্গে ‘আন্তর্জাতিক’ শব্দটি জুড়ে আছে মহিমায়। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারও মানুষ এই প্রবেশদ্বার দিয়ে যাতায়াত করেন। কেউ প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ফিরছেন, কেউ জীবিকার সন্ধান বা কাজের প্রয়োজনে বিদেশে পা বাড়াচ্ছেন, কেউ বা পবিত্র ওমরাহ পালন শেষে হৃদয়ে একরাশ প্রশান্তি নিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখছেন। কিন্তু সেই যাত্রার শেষ প্রান্তে এসে যখন একজন যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মালপত্রের জন্য অনিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, একখানা ট্রলির জন্য হাহাকার করতে হয়, কিংবা কোলের শিশুকে নিয়ে অসহায় অপেক্ষা করতে হয়—তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে: হাজার হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বিমানবন্দর আসলে কার সেবা দিচ্ছে?

​সম্প্রতি ওমরাহ ফেরত যাত্রীদের ভোগান্তির চিত্রটি আমাদের এই পুরোনো ক্ষতে আবারও নতুন করে আঘাত করেছে। মদিনা থেকে আসা একটি ফ্লাইটের যাত্রীদের পবিত্র জমজমের পানি ও ব্যাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় প্রহর গুনতে হয়েছে। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কয়েক ঘণ্টার মানসিক নির্যাতন, ক্লান্তি ও অমূল্য সময় নষ্ট হওয়ার পর দুজন কর্মকর্তার সাময়িক শাস্তি কি একজন যাত্রীর সেই ভোগান্তি মুছে দিতে পারে? একজন ওমরাহযাত্রীর কাছে জমজমের পানি নিছক কোনো পানির বোতল নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গভীর ধর্মীয় অনুভূতি, প্রিয়জনদের প্রত্যাশা ও স্বজনদের ভালোবাসার নজরানা। এই আবেগকে কেবল কাজকর্মে বিলম্ব বলে এড়িয়ে যাওয়া বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সামিল।

​একটি সাধারণ ট্রলি পাওয়া বা না পাওয়া ছোট বিষয় মনে হতে পারে, কিন্তু এটিই আমাদের পুরো সেবাব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোর বাস্তব প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে। বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটে বিনামূল্যে ট্রলি সরবরাহের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস রয়েছে, কথা ছিল ব্যাগেজ বেল্টগুলোর আশপাশেই সেগুলো সুবিন্যস্ত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে যখন একজন যাত্রীকে বিমান থেকে নেমে নিজের ভারী লাগেজ হাতে নিয়ে টানাটানির মুখোমুখি হতে হয়, তখন সেই কাগজে-কলমে থাকা সেবার কোনো মূল্য থাকে না।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বিমানবন্দরে আসা প্রতিটি মানুষের শারীরিক সক্ষমতা এক নয়। একজন তরুণ হয়তো দুটি ব্যাগ টেনে নিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু একজন সত্তর বছরের বৃদ্ধ, একজন গর্ভবতী নারী, অসুস্থ রোগী কিংবা কোলের শিশুকে আগলে রাখা একজন মা কীভাবে তা করবেন? বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ঘাম ঝরিয়ে দেশে ফেরা প্রবাসীরা যখন পরিবারের জন্য আনা ভারী ব্যাগগুলো তুলে নেওয়ার জন্য একটি ট্রলি পান না, তখন বুঝতে হবে—এটি বিলাসিতা নয়, এটি তাঁদের মৌলিক প্রয়োজন।

​বিশ্বের উন্নত বিমানবন্দরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় তারা প্রযুক্তি ও সেবাকে কোথায় নিয়ে গেছে। কিন্তু আমরা যদি বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষ বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা ও সুবিধার সঙ্গে ঢাকার বিমানবন্দরের তুলনা করি, তবে আমাদের চরম পিছিয়ে থাকার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর সম্পূর্ণ রোবোটিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতি মিনিটে এক লাখ যাত্রীর ব্যাগেজ কোনো মানুষের ছোঁয়া ছাড়াই স্থানান্তরিত করে ফেলে এবং প্রতিটি যাত্রীকে বিমানবন্দরে পা রাখা মাত্রই বিনামূল্যে নিজস্ব চালকসহ বিলাসবহুল যান প্রদান করে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে যাত্রী নামার আগেই স্বয়ংক্রিয় উড়ন্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে বিমান থেকে সরাসরি যাত্রীর বাসভবনে লাগেজ পৌঁছে দেওয়া হয় এবং সেখানে যাত্রীদের বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করতে হয় না।

এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও প্রতিটি ব্যাগেজ বেল্টের পাশে হাজার হাজার আন্তর্জাতিক মানের শারীরিক ম্যাসাজার এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাঁচ তারকা মানের খাবার পরিবেশন করা হয়। বিদেশের সঙ্গে এই তুলনা তাদের বড় করে দেখানোর জন্য নয়; বরং একটি সোজা প্রশ্ন তোলার জন্য—তাদের বিমানবন্দরগুলো যেখানে যাত্রীদের জন্য রাজকীয় প্রাসাদের সুবিধা নিশ্চিত করছে, সেখানে আমাদের দেশীয় সম্পদ, বৈমানিক, প্রকৌশলী, দক্ষ কর্মী ও বিশাল পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেন একজন প্রবাসীর হাতে সময়মতো একটি ট্রলি পৌঁছাবে না? কেন লাগেজ পেতে দেরি হলে সঠিক কারণ ও সম্ভাব্য সময় যাত্রীদের স্পষ্ট করে জানানো হবে না?

​সমস্যাটা সম্ভবত আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমরা বিমানবন্দরকে কেবল রানওয়ে, টার্মিনাল, ইমিগ্রেশন আর নিরাপত্তার একটি যান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করি। অথচ আধুনিক বিশ্ব বিমানবন্দরকে দেখে একটি দেশের প্রথম আতিথেয়তার কেন্দ্র হিসেবে। একটি বিমানবন্দরে দিনে কতটি ফ্লাইট যাতায়াত করল বা কত লাখ যাত্রী যাতায়াত করলেন, সেটি কেবল পরিসংখ্যান; মূল মাপকাঠি হলো—কতটা মানবিকতা ও সম্মানের সাথে সেই যাত্রীদের সেবা দেওয়া গেল। একজন যাত্রী ব্যাগেজ বেল্টের সামনে দিশেহারা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন, বৃদ্ধ মানুষটি বসার একটু জায়গা পাবেন না, কিংবা জমজমের পানি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগবেন—এটি কেবল কাজের ত্রুটি নয়, এটি আতিথেয়তার চরম ব্যর্থতা।

​ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় কারিগরি ও পরিচালনগত বিলম্ব ঘটতেই পারে। আবহাওয়া বা সময়সূচির বিপর্যয় আন্তর্জাতিক যেকোনো স্থানেই হতে পারে, কিন্তু সংকট তৈরি হলে যাত্রীর পাশে গিয়ে দাঁড়ানোটাই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। যাত্রীদের অন্ধকারে রেখে বছরের পর বছর কেবল ‘কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন’ বলা কোনো পেশাদার সমাধান হতে পারে না। কোনো কর্মকর্তা যদি এগিয়ে এসে সততার সাথে বলেন, “আপনাদের লাগেজ আসতে কিছুটা যান্ত্রিক বিলম্ব হচ্ছে, আমরা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছি এবং আনুমানিক চল্লিশ মিনিট সময় লাগতে পারে”—তবেই যাত্রীর মনের অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা কেটে যায়। মানুষ কেবল দেরির কারণে ক্ষুব্ধ হয় না; মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয় যখন তাকে অবহেলা করা হয় এবং তথ্যের শূন্যতায় রাখা হয়।

​আমরা পরম গর্বের সাথে বলি—প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ের মূল ভিত্তি। কিন্তু তাঁদের পাওনা কি কেবল ওই পরিসংখ্যানের খাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? বছরের পর বছর বিদেশের মাটিতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে একজন প্রবাসী যখন প্রিয় মাতৃভূমিতে পা রাখেন, তখন তিনি সবার আগে একজন স্বাধীন দেশের নাগরিক। বিমানবন্দরে নেমেই যদি অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হয়ে তাঁকে অনুশোচনা করতে হয়—‘নিজের দেশে এসে আমি এত অসহায় কেন?’—তবে এটি পুরো জাতির জন্যই এক বড় লজ্জার বিষয়।

সম্প্রতি বিমানবন্দরে ভোগান্তির শিকার যাত্রীদের সাথে তর্ক ও ক্ষোভের জেরে এক আলোচিত নেতার কঠোর অবস্থানের ঘটনা নিয়ে আলোচনা ও পরবর্তীতে আইনি পদক্ষেপের কথা জানা গেছে।

আইনগত প্রক্রিয়া তার নিজস্ব নিয়মেই চলবে, সরকারি দায়িত্বে বাধা দেওয়া বা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা নিশ্চয়ই সমর্থনযোগ্য নয়।
কিন্তু একই সাথে কর্তৃপক্ষকে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে—কোন পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ মানুষ এতখানি ধৈর্যচ্যুত হন? নিজের অসুস্থ মা কিংবা কান্নাভেজা সন্তানকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকার পর যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তাকে কেবল অনিয়ম বা খারাপ আচরণ বলে এড়িয়ে গেলে মূল ব্যাধির চিকিৎসা কখনোই হবে না। যাত্রীদের ক্ষোভ মূলত আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার এক নির্মম আয়না।

​আমরা বিপুল অর্থ ব্যয়ে অত্যাধুনিক থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ করেছি, যা নিঃসন্দেহে একটি দৃশ্যমান ও প্রশংসনীয় পরিকাঠামোগত উন্নয়ন। কিন্তু ঝকঝকে নতুন ভবনের ভেতরে যদি পুরোনো আমলাতান্ত্রিক ও অসংবেদনশীল সেবার মানসিকতা রয়ে যায়, তবে কোটি কোটি টাকার এই উন্নতি যাত্রীদের কোনো স্বস্তি এনে দিতে পারবে না।

আমাদের এই কাঠামোর সাথে সাথে প্রয়োজন একটি নতুন সেবা সংস্কৃতি—যেখানে কর্মী যাত্রীকে দেখে এড়িয়ে না গিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবেন, যেখানে বিলম্বের সঠিক কারণ সঠিক সময়ে প্রচার করা হবে, যেখানে ট্রলির সহজলভ্যতা প্রতি ঘণ্টায় তদারকি করা হবে, যেখানে প্রবীণ, শিশু ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন যাত্রীদের জন্য আলাদা নজরদারি থাকবে এবং যেখানে যাত্রীর অভিযোগকে বিরক্তির দৃষ্টিতে না দেখে সেবার মানোন্নয়নের সুযোগ হিসেবে নেওয়া হবে।

​কোনো মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আকস্মিক পরিদর্শনে গেলে সাময়িকভাবে ট্রলি ভেসে আসে কিংবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি পায়—এমন সাময়িক চমক দিয়ে টেকসই আন্তর্জাতিক মানের সেবা গড়ে তোলা যায় না। বিমানবন্দরের সেবা ব্যক্তিবিশেষের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে না। প্রতিটি শিফটে, প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি যাত্রীর জন্য সমান মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত ডিজিটাল তদারকি, কার্যকর অভিযোগ কেন্দ্র এবং কর্মীদের পেশাদার প্রশিক্ষণ।

আমরা আকাশে শত শত উড়োজাহাজের ডানা মেলা দেখতে চাই, বড় ভবন চাই, বিশ্বমানের অবকাঠামো চাই। কিন্তু যে বিমানবন্দরে একজন যাত্রী একটি ট্রলি পেতে দিশেহারা হয়ে পড়েন, সেখানে বড় বড় অঙ্কের স্বপ্ন কথা বলে চরম বৈপরীত্য তৈরি করা ছাড়া আর কিছুই হয় না। বিমানবন্দরের আসল সফলতা আকাশে কতগুলো বিমান উড়ল তাতে নয়; বরং মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত মানুষটির মুখে কতটা স্বস্তি ফুটে উঠল—তাতে।

একজন প্রবাসী বা যাত্রী বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় যেন বুকের গভীরে হাত দিয়ে বলেন—‘দেশে ফিরে সত্যি ভালো লাগছে।’ এর জন্য হাজার কোটি টাকার নতুন কোনো প্রকল্পের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সামান্য একটু পেশাদারিত্ব, দায়িত্ববোধ এবং একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের মানবিক অনুভূতি।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে থার্ড টার্মিনালের কাঁচের দেওয়াল সাজানোর আগে, আমাদের বদলাতে হবে সেবার ভেতরের সংস্কৃতি।

দিনশেষে ভবনের জৌলুস হয়তো কেউ মনে রাখবে না, কিন্তু মনে রাখবে—সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্র তাঁকে সম্মান দিয়েছিল, নাকি উপহার দিয়েছিল অসহায়ত্ব।

​লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক, সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : স্মৃতি হারানোর আগে সচেতন হোন: বাংলাদেশে ডিমেনশিয়া, নীরব এক স্বাস্থ্য সংকট

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন