হঠাৎ কোথাও আগুন লাগলে মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। দিশেহারা হয়ে পড়েন মানুষ। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে না গিয়ে যদি সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করা যায়, তবে বাঁচানো সম্ভব অনেক প্রাণ ও অমূল্য সম্পদ। ঠিক এমন একটি আত্মবিশ্বাসী বার্তাই ছড়িয়ে দেওয়া হলো নেত্রকোনার দুর্গাপুরে।
বইয়ের পাতার তাত্ত্বিক জ্ঞানের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের চরম সত্যের মুখোমুখি করতে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ চত্বর হয়ে উঠেছিল ব্যতিক্রমী পাঠশালা। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের যৌথ আয়োজনে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় দুর্যোগ মোকাবিলা ও অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ক এক প্রাণবন্ত মহড়া।
এ আয়োজনের মূল আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমানের সুনিপুণ নির্দেশনায় মহড়াটি পরিচালিত হয়। কীভাবে বাড়িতে বা প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগলে তা দ্রুত নেভানো যায় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিজেকে ও চারপাশকে সুরক্ষিত রাখতে হয়, তার বাস্তব ও ব্যবহারিক কলাকৌশল অত্যন্ত সাবলীলভাবে প্রদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। চোখের সামনে আগুন নেভানোর কৌশল দেখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল শিক্ষার্থীরা।
মহড়ায় অংশ নেওয়া নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর কণ্ঠে ছিল নতুন কিছু শেখার তৃপ্তি। সে জানায়, “আগে বাড়িতে বা আশপাশে আগুন লাগলে কীভাবে তা নেভাতে হয়, সে সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। তবে আজকের মহড়ায় ব্যবহারিকভাবে বিষয়টি শেখার দারুণ সুযোগ হয়েছে, যা আমাদের জীবনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমরা আজ একটি বড় শিক্ষা পেয়েছি- দুর্যোগের সময় কোনোভাবেই আতঙ্কিত হওয়া চলবে না, বরং সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।”
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি মহড়া থেকে শিক্ষা নিয়েছেন উপস্থিত নানা শ্রেণি-পেশার মানুষও। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. জহুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সচেতনতামূলক এই আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ সাদাত।
সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এই আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিপা বিশ্বাস, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. অমিত দত্ত, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বজলুর রহমান আনছারী, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জামাল উদ্দিন মাস্টার, দুর্গাপুর প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুম বিল্লাহ এবং একাডেমিক সুপারভাইজার মুহাম্মদ নাসির উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনেরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাত মহড়ার সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব তুলে ধরেন। উপস্থিত সবার উদ্দেশে তিনি বলেন, “নানা ধরনের প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় করণীয় বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের এই মহড়া অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিশেষ করে আমাদের অফিস-আদালত, বাসাবাড়ি, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকে। এসব দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রাথমিকভাবে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা জানা থাকলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো সম্ভব। আজকের মহড়া শুধু শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, বরং উপস্থিত সকলের জন্যই অত্যন্ত উপকারী।”
দুর্যোগ কখনোই বলে-কয়ে আসে না, তবে পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে তার ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। দুর্গাপুরের এই আয়োজন যেন সেই চিরন্তন সত্যটিকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিল। এমন সচেতনতামূলক কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মনে সাহস জোগানোর পাশাপাশি দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গড়তে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পড়ুন : সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা আধুনিকায়নের আশ্বাস রেলমন্ত্রীর


