আমাদের সমাজে প্রচলিত ছক আছে- দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাস করা মানেই দেশ-বিদেশের নামিদামি প্রতিষ্ঠানে মোটা অঙ্কের বেতনের চাকরি। ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অলিখিত প্রতিযোগিতা। কিন্তু এই প্রচলিত ছকের বাইরেও এমন কিছু মানুষ থাকেন, যারা সফলতার সংজ্ঞা খোঁজেন মনের প্রশান্তিতে; কংক্রিটের ইমারত গড়ার চেয়ে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর হওয়াতেই যারা জীবনের সার্থকতা খুঁজে পান। এমনই একজন ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষ নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাইলা সারাফ লিজা।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বিলাসবহুল জীবন, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো দেশসেরা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাজীবন এবং বুয়েট থেকে প্রকৌশল বিদ্যার ডিগ্রি সবকিছু ছাপিয়ে লিজা আজ নেত্রকোনার ছিমছাম এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের ‘লিজা আপা’ বা তাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
নাইলা সারাফ লিজার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরোটাই ঢাকা শহরে। কাস্টমস অফিসার বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে লিজা। মোহাম্মদপুরে পাঁচতলার ফ্ল্যাট থেকে লিফটে ওঠা-নামা, যাতায়াতের জন্য সার্বক্ষণিক বরাদ্দ থাকা নিজস্ব প্রাইভেট কার, প্রিন্স বাজার বা মিনা বাজারে কেনাকাটা- এমন এক আয়েশি ও স্বাচ্ছন্দ্যময় শৈশব-কৈশোর কেটেছে তার। ঢাকার ব্যস্ত আর যান্ত্রিক জীবনের বাইরে এক পা-ও ফেলতে হয়নি কখনো। জন্মসূত্রে তার শেকড় নেত্রকোনায়। বাবার বাড়ি, দাদার বাড়ি- সব মিলিয়ে নেত্রকোনা তার নাড়ির টান। তাইতো ঢাকার সেই জাঁকজমকপূর্ণ জীবন ছেড়ে আজ তিনি শেকড়ের কাছেই থিতু হয়েছেন।
বুয়েট থেকে পড়ালেখা শেষ করে ২০০৯ সালের দিকে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন লিজা। প্রথমে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১১-১২ সালের দিকে যোগ দেন জনতা ব্যাংকে। প্রকৌশলী বা ব্যাংকারের চেয়ার তাকে খুব বেশি দিন আটকে রাখতে পারেনি। তিনি নিজেই বলেন, “জব তো কখনো খারাপ হয় না। তবে আমার নিজেকে কখনো মনে হয়নি যে ওই জবগুলোতে আমি খুব বেশি ফিট।”
মনের ভেতরের সেই শূন্যতা পূরণের ডাক আসে ২০১৭ সালে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নেত্রকোনার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। একজন বুয়েট গ্র্যাজুয়েট প্রাথমিক স্কুলে যোগ দিচ্ছেন- এমন খবরে অনেকেই হয়তো অবাক হয়েছিলেন। লিজা নিজেও শুরুতে দ্বিধায় ছিলেন। প্রথম তিন মাস তারও মনে হয়েছিল- ‘পারব তো এখানে থাকতে?’ সহকর্মীদের আন্তরিকতা আর শিশুদের মায়ামাখা মুখ তাকে আটকে ফেলে। প্রতিদিন নতুন নতুন চাকরির প্রস্তাব আসার পরও তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এখানেই তিনি থাকবেন। আজ দীর্ঘ প্রায় আট বছর ধরে তিনি পরম মমতায় আগলে রেখেছেন তার বিদ্যালয়টিকে।
লিজার কাছে শিক্ষকতা মানে কেবল ক্লাসে গিয়ে বইয়ের পড়া গিলিয়ে দেওয়া নয়। তার মতে, একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য অনেক বড় ডিগ্রির চেয়ে ‘প্যাডাগজিক্যাল নলেজ’ বা শিক্ষাদান পদ্ধতি জানাটা বেশি জরুরি।
তিনি বলেন, “শিক্ষক হওয়ার জন্য শিশুদের ভেতরে প্রবেশ করতে পারা এবং তাদের মোটিভেট করার ক্ষমতা থাকা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমি নিজেকে খুব সাধারণ একজন মানুষ মনে করি। আমি শুধু ওদের মোটিভেট করার চেষ্টা করি, উৎসাহ দিই। শিক্ষার্থী নিজে থেকে না শিখলে আমি সারাদিন ঘ্যানঘ্যান করলেও কোনো লাভ হবে না।”
ক্লাসরুমে লিজার রূপটা একেবারেই অন্যরকম। তিনি শিক্ষার্থীদের শাসন করা রাশভারী কোনো শিক্ষক নন। টিফিন পিরিয়ডে ক্লাসরুমে বসেই শিশুদের সাথে টিফিন ভাগাভাগি করে খান তিনি। তার কথায়, “আমি যখন পড়াই, তখনো যদি কেবল নিজেকে শিক্ষক মনে করি, তাহলে ওরা আমাকে ভয় পাবে। আমি ক্লাসে ওদের বন্ধু। ওরা কোনো ভুল করলেও নির্দ্বিধায় আমার কাছে স্বীকার করতে পারে।”
লিজা নিজে অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা। সাহিত্য চর্চা, ছবি আঁকা থেকে শুরু করে নাচ, গান, আবৃত্তি- সবকিছুর প্রতিই তার গভীর অনুরাগ। আর এই গুণগুলোই তাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার সাথে আত্মিক বাঁধনে জড়িয়েছে। লিজা মনে করেন, একজন প্রাথমিক শিক্ষককে পড়াশোনার পাশাপাশি এসব সাংস্কৃতিক বিষয়েও ধারণা রাখতে হয়, যা শিশুদের মানসিক বিকাশে সাহায্য করে। নিজের ভেতরের শিল্পসত্তাকে তিনি তার শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেন বলেই অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে এই পেশাটিকে তিনি বেশি ভালোবেসেছেন।
একসময়ের ঢাকার কোলাহলমুখর জীবন ছেড়ে আসা লিজা কিছুটা নিভৃতচারী। একা ও নীরবে থাকতে পছন্দ করেন। বর্তমানে স্বামী ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে নিয়ে নেত্রকোনাতেই তার সুখের সংসার। ছেলেও পড়ছে তার নিজেরই স্কুলে। ঢাকার সেই ‘কেউ কারও ধার ধারে না’ ধরনের যান্ত্রিক সামাজিকতার বদলে নেত্রকোনার পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বন্ধন তাকে মুগ্ধ করেছে। শুরুর দিকে যাতায়াত বা মফস্বলের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে সামান্য বেগ পেতে হলেও, এখন তিনি পুরোপুরি এখানকারই একজন।
নাইলা সারাফ লিজা প্রমাণ করেছেন, বড় ডিগ্রি মানেই কেবল বড় চেয়ারের মোহ নয়। ইচ্ছে থাকলে সেই ডিগ্রির আলো ছড়িয়ে দেওয়া যায় সমাজের সবচেয়ে তৃণমূল পর্যায়েও। যতদিন বাংলাদেশে থাকবেন, শিক্ষকতা পেশাতেই নিজেকে যুক্ত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। বুয়েটের মেধাবী এই মুখ হয়তো আজ কোনো বড় প্রজেক্টের নকশা আঁকছেন না, কিন্তু তিনি প্রতিদিন সযত্নে এঁকে চলেছেন আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের নকশা। আর এখানেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
পড়ুন : সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা আধুনিকায়নের আশ্বাস রেলমন্ত্রীর


