ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি বুধবার (১৪ অক্টোবর) ঘোষণা দিয়েছে যে, সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলো তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু এবং সেখানে তারা আরও হামলা চালাবে। এর আগেই সৌদি আরবের তেল জায়ান্ট কোম্পানি আরামকোর সদর দপ্তর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সংঘাতসংক্রান্ত সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, ওই হামলায় ভবনটির মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
হুতিদের দাবি, ইয়েমেনে পরিচালিত সৌদি সামরিক পদক্ষেপের পাল্টা জবাব হিসেবেই তারা এসব আক্রমণ করছে। একই সাথে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই এই যুদ্ধকে আরও তীব্র রূপ দেওয়ার হুমকি দিয়েছে গোষ্ঠীটি।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের আক্রমণের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে। গত শনিবার রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। এরপর মঙ্গলবার রাতে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে আরামকোর সদর দপ্তরে হামলা চালানো হলে সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। রয়টার্সকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ৩ জন ব্যক্তি জানিয়েছেন, আগুন ভবনটির কয়েকটি তলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। যদিও সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দাবি, ক্ষয়ক্ষতি ও আগুনের মাত্রা ছিল বেশ সীমিত।
হামলার পরও আরামকোর দাপ্তরিক কার্যক্রম সচল ছিল বলে দুইজন সূত্র নিশ্চিত করেছেন, তবে কর্মীদের নিজ নিজ বাসা থেকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটির বিষয়ে রয়টার্স যোগাযোগ করলে আরামকো কর্তৃপক্ষের কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ধাহরানে অবস্থিত আরামকোর মূল কেন্দ্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখান থেকেই দেশটির স্থল ও নৌপথের তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন, শোধনাগার এবং তেল রফতানি ব্যবস্থার বিশাল পরিচালনা তদারক করা হয়। অন্যদিক, রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি গত এক সপ্তাহেই চারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শনিবারের আক্রমণটি ছিল গত এক দশকে সৌদিতে হওয়া সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বিমানবন্দরটির চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং বহু আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাও সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে।
বুধবার এক বিবৃতিতে হুতিরা জানায়, তারা ধাহরানে আরামকোর স্থাপনা, রিয়াদের বিমানবন্দর এবং রাজধানীর একটি তেল শোধনাগারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে এই সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা, সাধারণ নাগরিক ও তেল স্থাপনায় কর্মরত কর্মীদের অবিলম্বে সৌদির এসব বিমানবন্দর ও তেলকেন্দ্রগুলো ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
একই দিন রিয়াদের দিকে ধেয়ে আসা হুতিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এই ঘটনার সময়ে সৌদি রাজধানীতে একাধিক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। এক প্রত্যক্ষদর্শী নিশ্চিত করেছেন যে, সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকির কারণে রিয়াদে সতর্কতা জারি করা হলেও পরবর্তীতে তা তুলে নেওয়া হয়। তবে বিস্ফোরণের আসল কারণ স্পষ্ট করেনি কর্তৃপক্ষ। গণমাধ্যম দপ্তরের সঙ্গে রয়টার্স যোগাযোগ করলেও তাদের পক্ষ থেকে উত্তর মেলেনি।
উদ্বেগজনক এই সংঘাত বৃদ্ধির ফলে তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অর্থনৈতিক রূপান্তরের যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গ্রহণ করেছিলেন, তা মারাত্মক ধাক্কার মুখে পড়েছে।
পটভূমি ও মানবিক বিপর্যয়:
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরকারি পক্ষকে সৌদি সমর্থন অব্যাহত রাখার কারণেই এ পাল্টা হামলা বলে জানিয়েছে হুতিরা। গত মাসে পুনরায় শুরু হওয়া লড়াইয়ে সৌদির প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে এই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে।
২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে তৎকালীন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে উচ্ছেদ করলে ইয়েমেনে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। এর প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালে সরকারের পক্ষে সেনা অভিযান শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলে কিছুটা শান্তি ফিরলেও সম্প্রতি হুতিরা লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছালে ইয়েমেন সরকারকে বাঁচাতে নতুন করে সেনা নামায় সৌদি আরব।
বর্তমানে তীব্র লড়াইয়ের প্রভাবে ইয়েমেনের ভেতরে চরম মানবেতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস জানিয়েছে, রণাঙ্গনে সংঘর্ষ বাড়ায় আহত রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, সরকারি বাহিনীর অধীনস্থ তাইজ শহরটি হুতিরা অবরুদ্ধ করে রাখায় অন্তত ৬ লাখ মানুষ— যার মধ্যে ২ লাখের বেশি নারী ও শিশু রয়েছে— জীবনরক্ষাকারী ত্রাণ ও সহায়তা প্রাপ্তি থেকে একদম বঞ্চিত হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্য সূত্র না পাওয়ায় সব শেষ সংঘর্ষের ক্ষয়ক্ষতি, হতাহত ও সামরিক অগ্রগতির তথ্য এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
পড়ুন : বাংলাদেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় সহায়তার আশ্বাস যুক্তরাষ্ট্র-চীনের
সা/


