তরুণ সমাজ ও ছাত্ররাই যেকোনো দেশের উন্নয়ন, পরিবর্তন ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, ত্যাগ, অদম্য মেধা ও সমাজের প্রতি তাদের অবদানকে সম্মান জানাতে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব ছাত্র দিবস’ (World Students’ Day)। প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে দিবসটি উদযাপিত হয়। তরুণ প্রজন্মকে স্বপ্নের পেছনে ছুটতে এবং শিক্ষার আলোয় সমাজকে আলোকিত করতে এই দিবসটি বিশেষ অনুপ্রেরণা জোগায়।
দিবসটির প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস
বিশ্ব ছাত্র দিবসের সূচনা মূলত ভারতের একাদশ রাষ্ট্রপতি, বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ ড. এ পি জে আবদুল কালামের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে। ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
যদিও ড. কালাম বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বিশ্বজুড়ে নন্দিত ছিলেন, তবে তিনি নিজেকে সবসময় একজন ‘শিক্ষক’ হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ছাত্রদের সঙ্গে মতবিনিময় করা, তাদের স্বপ্ন দেখতে শেখানো এবং শিক্ষার প্রসারে কাজ করা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ। ২০১০ সালে জাতিসংঘ তার এই মহান শিক্ষানুরাগ, শিক্ষার্থীদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অবদানকে সম্মান জানিয়ে ১৫ অক্টোবর তার জন্মবার্ষিকীকে ‘বিশ্ব ছাত্র দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
শিক্ষায় ড. কালামের দর্শন ও বিশ্ব ছাত্র দিবসের বার্তা
ড. এ পি জে আবদুল কালাম বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শ্রেণীকক্ষে। তার বিখ্যাত একটি উক্তি ছিল:
“স্বপ্ন তা নয় যা তুমি ঘুমিয়ে দেখো, স্বপ্ন সেটাই যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না।”
বিশ্ব ছাত্র দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু মূল চেতনা জাগিয়ে তোলার দিন:
১. বড় স্বপ্ন দেখার সাহস: শিক্ষার্থীদের বড় স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কঠোর পরিশ্রম করার প্রেরণা দেওয়া।
২. জ্ঞান অর্জন ও উদ্ভাবন: কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন কিছু উদ্ভাবন এবং সৃজনশীল চিন্তা করার মানসিকতা তৈরি।
৩. নৈতিকতা ও মূল্যবোধ: শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল চাকরি পাওয়া নয়, বরং একজন সৎ, চরিত্রবান ও আদর্শ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠা।
বিশ্ব অর্থনীতি ও সমাজে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা
বর্তমান একুশ শতকে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক বৈষম্য, প্রযুক্তিগত বিপ্লব এবং রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সামাজিক পরিবর্তন: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অন্যায়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণ ও ছাত্র সমাজ সবসময় প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন: তরুণ শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন স্টার্টআপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন গতি আনছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ছাত্র দিবস
বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষার্থীদের অবদান বিশ্ব মানচিত্রে বিরল। আন্তর্জাতিকভাবে ১৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব ছাত্র দিবস’ পালিত হলেও, বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কারণে আলাদাভাবে ১৭ সেপ্টেম্বর ‘জাতীয় ছাত্র দিবস’ (১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের স্মরণে) পালিত হয়।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা জাতীয় সংকটে দেশের মূল ঢাল। ফলে বিশ্ব ছাত্র দিবস বাংলাদেশের তরুণদের জন্য বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেধা ও অধিকারকে নতুন করে তুলে ধরার একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করে।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
আজকের বিশ্বের শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে:
ডিজিটাল বৈষম্য: উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহারে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক চাপ: পড়াশোনার চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতার কারণে বহু শিক্ষার্থী মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগছে।
কর্মমুখী শিক্ষার অভাব: প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আধুনিক শ্রমবাজারের চাহিদার মিল না থাকায় শিক্ষা শেষে বেকারত্বের হার বাড়ছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সরকার, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সুযোগ বাড়ানো, গবেষণা খাত শক্তিশালী করা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
বিশ্ব ছাত্র দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের বিশ্বনেতা, বিজ্ঞানী, শিক্ষক ও সংস্কারক। তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা, মানসম্মত শিক্ষা ও সঠিক সুযোগ দেওয়া গেলে তারা বিশ্বকে আরও সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। বিশ্ব ছাত্র দিবসে বিশ্বের সকল শিক্ষার্থীর প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও শুভকামনা—তারা যেন শিক্ষা ও মেধা দিয়ে বিশ্বকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে পারে।
পড়ুন : বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস আজ
সা/


