রাজনীতির মূল লক্ষ্য যদি হয় জনকল্যাণ, তবে সেই কল্যাণের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি দেখা যায় যখন ক্ষমতার চেয়ারে বসা মানুষটি সাধারণ মানুষের চোখের আলো ফেরানোর দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ১১ টার দিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দা সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ঠিক এমনই মানবিক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
সেখানে হাজারো সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ভিড়। চোখে ছানি, দৃষ্টি ঝাপসা- এমন অসংখ্য অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত বিনামূল্যে চক্ষু শিবির পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
গতানুগতিক রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে এদিন তিনি শোনালেন মানবতার গল্প, দিলেন সমাজের বিত্তবানদের প্রতি মানবিক এক জাগরণের ডাক।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত সাধারণ মানুষ, চিকিৎসাপ্রার্থী ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “হেলথ ক্যাম্প বা এই ধরনের চিকিৎসাসেবা নির্বাচনের সাথে সম্পর্কিত নয়। আমরা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। মানুষের জন্য কাজ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
তিনি জানান, গত দুই বছর ধরেই তারা এমন কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন, এটি তাদের তৃতীয় বছর। বিগত সময়ে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিকূলতার কারণে মানবিক কাজগুলো স্বাধীনভাবে করা সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “গত ২৪ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আমরা এই কার্যক্রম ব্যাপকভাবে চালিয়ে আসছি। শুধু কলমাকান্দা নয়, দুর্গাপুর, নাজিরপুর, লেঙ্গুরা, গাওকান্দিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় এই ক্যাম্প চলমান রয়েছে।”
চক্ষু শিবির শুধু ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনের লজিস্টিক ও ব্যবস্থাপনা রীতিমতো চমকপ্রদ। ডেপুটি স্পিকার জানান, গত বছর কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর মিলিয়ে আনুমানিক সাড়ে ছয় হাজার রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার রোগীর চোখের ছানি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অপারেশন করা হয়েছে।
এবারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, “যাদের চোখের ছানি অপারেশনের প্রয়োজন হবে, তাদের তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। বরাবরের মতোই আমাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তাদের কলমাকান্দা থেকে ময়মনসিংহে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে দুই-তিন দিন রেখে অপারেশন শেষে, আবার আমাদের দায়িত্বেই প্রতিটি রোগীকে তাদের নিজ বাড়িতে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হবে। যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসা- পুরো প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সম্পন্ন হবে।”
সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই রাজনীতিক। তিনি বলেন, “আজ যারা চিকিৎসা নিচ্ছেন, আমি তাদের দরিদ্র বলব না, তারা বিভিন্নভাবে বঞ্চিত ও অসহায়। বঞ্চিত এই মানুষের পাশে দাঁড়ানো সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব।”
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র বা সরকারের একার পক্ষে সব করা সম্ভব নয়। তাই সমাজের বিত্তবানদের নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সামাজিক বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটু সদিচ্ছা থাকলেই বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। আমি আশা করব, সমাজের বিত্তবানরা অসহায় মানুষের সেবায় নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসবেন।”
সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে এই কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানান ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সকাল থেকে অক্লান্ত পরিশ্রম করা স্বেচ্ছাসেবক ও উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজের দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কায়সার কামাল বলেন, “এই এলাকার মানুষ আমাকে নির্বাচিত করেছেন। নির্বাচনের আগে আমি তাদের কথা দিয়েছিলাম, তাদের যেকোনো প্রয়োজনে সর্বাঙ্গীণভাবে আমি পাশে থাকব। গত দুই বছরের তুলনায় এবার আমার দায়বদ্ধতার জায়গাটা আরও বেশি। আমি শুধু আমার সেই ওয়াদা পূরণের চেষ্টা করে যাচ্ছি।”
কলমাকান্দার ওই বিদ্যালয় মাঠটি এদিন শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল না, এটি পরিণত হয়েছিল পারস্পরিক নির্ভরতা ও আস্থার মিলনমেলায়। চোখের আলো ফিরে পাওয়ার আশায় আসা প্রবীণ মানুষগুলোর চোখে-মুখে যে স্বস্তির ছাপ দেখা গেছে, তা যেন প্রমাণ করে- সঠিক নেতৃত্ব ও মানবিক উদ্যোগ হলে সমাজের যেকোনো অন্ধকার দূর করা সম্ভব।
পড়ুন : জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
সা/


