চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত তিনটি টার্মিনালের একটি নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান পিএসএর সঙ্গে শিগগিরই চুক্তি হতে পারে। বর্তমানে প্রকল্পের থ্রি-ডি সিমুলেশনের কাজ চলছে। এই কাজ শেষ হলে শুরু হবে ব্রেক ওয়াটার, নেভিগেশন চ্যানেল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের পরবর্তী ধাপ। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩০ সালে প্রথম টার্মিনালের কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর চাপ কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে বে-টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি পুরোপুরি চালু হলে বন্দরের কনটেইনার ও পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে বড় আকারের জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে, যা আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে সহায়তা করবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, বে-টার্মিনালের থ্রি-ডি সিমুলেশনের কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, অল্প সময়ের মধ্যে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। এরপর টেন্ডার ডকুমেন্ট প্রস্তুত এবং নেভিগেশন চ্যানেল ও ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি জানান, নেভিগেশন চ্যানেল ও ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংক ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে। প্রকল্পের এই অংশের নির্মাণকাজ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই করবে। অন্যদিকে, টার্মিনাল নির্মাণ, হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম স্থাপন এবং পরবর্তী সময়ে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে।
বে-টার্মিনাল প্রকল্পে পৃথক তিনটি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হবে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল, যেখানে কনটেইনারের পাশাপাশি খোলা পণ্যও খালাস করা যাবে। বাকি দুটি হবে কনটেইনার টার্মিনাল। এসব টার্মিনালের মাধ্যমে বন্দরের পণ্য ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের প্রথম টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য সিঙ্গাপুরের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পিএসএর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে চুক্তি হতে পারে বলে সম্প্রতি চট্টগ্রামে একটি অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
বাকি দুটি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো টার্মিনাল নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম স্থাপন করবে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তারা টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ পাবে। এ জন্য বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তাই প্রকল্পে আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো নৌপথের গভীরতা। চ্যানেলের গভীরতা কম হওয়ায় বড় জাহাজ চলাচলে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জাহাজকে জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এতে পণ্য পরিবহন ও জাহাজ চলাচলের সময়সূচিতে প্রভাব পড়ে।
বে-টার্মিনাল চালু হলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নেভিগেশন চ্যানেলের গভীরতা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নত করা হবে। ফলে বড় আকারের জাহাজ চলাচলের সুযোগ বাড়বে এবং ভাটার সময়ও জেটিতে জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর পতেঙ্গা ও উত্তর হালিশহর এলাকার সমুদ্র উপকূল ঘেঁষে প্রায় আড়াই হাজার একর জায়গায় বে-টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সাগরে ৮০০ থেকে ১২০০ মিটার প্রস্থের নেভিগেশন চ্যানেল থাকবে। এর মাধ্যমে ১২ মিটার ড্রাফট ও ২৮০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ ভেড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এমনকি একসঙ্গে প্রায় ছয় হাজার কনটেইনার বহনে সক্ষম জাহাজও এ টার্মিনালে আসতে পারবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর বছরে প্রায় ৩৪ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে। টিইইউএস হলো ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কনটেইনারের সমমানের পরিমাপ। বে-টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে বছরে ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এই সক্ষমতা বৃদ্ধি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ বাড়লে পণ্য পরিবহনে চাপ কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চাহিদা মোকাবিলা সহজ হবে। পাশাপাশি বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে পণ্য পরিবহনের সময় ও পরিচালন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বে-টার্মিনাল বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে। প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে আগামী প্রায় ১০০ বছর নতুন টার্মিনাল নির্মাণের প্রয়োজন হবে না বলেও আশা করা হচ্ছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যের চাহিদা কীভাবে বাড়ে, তার ওপর।
সব মিলিয়ে বে-টার্মিনাল প্রকল্পের অগ্রগতি চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। থ্রি-ডি সিমুলেশন শেষ করে নির্মাণকাজ শুরু, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা এখন প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজ এগোলে ২০৩০ সালে প্রথম টার্মিনাল চালুর মধ্য দিয়ে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
পড়ুন:ইউরোপে পোশাক রপ্তানিতে মন্দা কাটছে, বাংলাদেশের মূল্যহ্রাস ও বাজার হিস্যা নিয়ে উদ্বেগ
ইমি/


