ডিসেম্বর ঘিরে অস্থিরতার চেষ্টা, নিরাপত্তার ফাঁক গলে সক্রিয় কারা?

একদিকে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি, অন্যদিকে কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাটের পর মামলার বাদীকে হত্যার হুমকি। কোথাও পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় দেখানো হচ্ছে, কোথাও ছড়ানো হচ্ছে গুজব, আবার কোথাও ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক এসব ঘটনা জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর মধ্যে সামনে এসেছে ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতার কথাও।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, কিছু চক্র পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। তবে এসব ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না এবং ডিসেম্বরকে ঘিরে কথিত তৎপরতার সঙ্গে অপরাধের ঘটনাগুলোর সম্পর্ক কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তসাপেক্ষ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ গণমাধ্যমকে বলেন, একটি কুচক্রী মহল ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়াতে চাচ্ছে। তারা পুলিশ-প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এই অপচেষ্টা সফল হবে না।

তিনি বলেন, পুলিশ নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সব ধরনের চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও উসকানিদাতাকে আইনের আওতায় আনছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সামনের দিনগুলোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও জোরালো হবে।

গত ২২ অক্টোবর নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় মাইকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে প্রচার চালানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে জনমনে আতঙ্ক ও আওয়ামী লীগকে নিয়ে আলোচনা তৈরির উদ্দেশ্যে এ ধরনের তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তবে ওই প্রচারের সঙ্গে অন্য ঘটনাগুলোর কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ তাদের পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে বসে ষড়যন্ত্র করছে। তবে সাধারণ মানুষ সতর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আলাল বলেন, আওয়ামী লীগের অপকর্মের বিচার হবে আইন অনুযায়ী।

আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ জন্ম থেকেই হিংস্র। ২৩ জুন তাদের জন্মতারিখ। আর সেই ২৩ জুনই পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য স্তিমিত হয়েছিল। যাদের স্বাধীনতা ভালো লাগে না, তাদেরই বিচরণ বেশি আওয়ামী লীগে। তারা জাতীয় সংসদের স্পিকারকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। বিনা অপরাধে বহু মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে, রক্ষীবাহিনী দিয়ে মানুষ মেরেছে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, এখন যেসব ঘটনা ঘটছে, তা ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ঘটাচ্ছে, নাকি সরকারের ভেতর থেকে ঘটানো হচ্ছে, সেটি তদন্তের বিষয়। আওয়ামী সন্ত্রাসী বা অন্য কেউ এসব ঘটনা ঘটালে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে সাম্প্রতিক কয়েকটি অপরাধের ঘটনা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শনিবার ভোরে রাজধানীর মগবাজারে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গাড়িতে তিনি বা তাঁর চালক কেউই ছিলেন না। গুলিতে চালকের পেছনের আসনের কাচ ভেঙে যায়। ঘটনাস্থল থেকে একটি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে পুলিশ।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাত ৮টার দিকে বিশাল সেন্টারের তৃতীয় তলায় নিজের স্টুডিওতে আসেন আসিফ আকবর। সেখানে তাঁর কয়েকজন বন্ধু ছিলেন। রাত ৩টার দিকে বন্ধুরা চলে গেলেও তিনি ভবনটিতে ছিলেন। ভোরে গুলির শব্দ শুনে নিচে নেমে আসেন তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মগবাজার মোড় থেকে মালিবাগের দিকে আসা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিশাল সেন্টারের সামনে থামে। সেখান থেকে একজন নেমে আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে আবার অটোরিকশায় উঠে মালিবাগের দিকে চলে যান। হামলাকারীর চেহারা শনাক্ত করা যায়নি। অটোরিকশাটিতে আরও কেউ ছিলেন কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ভবনটিতে একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও অধিকাংশ অচল থাকায় তদন্তে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে। হামলাকারীকে শনাক্ত করতে আশপাশের এলাকার ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। আসিফের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না কিংবা হামলার পেছনে ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানান হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং উদ্ধার করা গুলির খোসা পরীক্ষা করে গুলির ধরন জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে আসিফ আকবরের গাড়িতে গুলির ঘটনায় সংগীতাঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। চলচ্চিত্রাভিনেতা ওমর সানীসহ অনেকে ঘটনাটিকে ‘অশনিসংকেত’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে হামলার কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

শুধু রাজধানীর এই ঘটনাই নয়, পুরান ঢাকার হাজারীবাগে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয় ও গুদামে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনাও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে একদল দুর্বৃত্ত প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের লোক পরিচয় দেয়। তাদের দাবি, জমির মাসিক ভাড়া চার লাখ টাকা এখন থেকে ইমনের লোকদের দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দুই বছর আগে শিকদার গ্রুপের কাছ থেকে চুক্তির মাধ্যমে জমিটি ভাড়া নিয়েছিল তারা। কিন্তু দুর্বৃত্তরা ভাড়া ইমনের লোকদের দিতে চাপ দেয়। এ সময় কার্যালয় ও গুদামে ভাঙচুর এবং মালামাল লুট করা হয়। হামলার আগে আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরা ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা মাইনুল ইসলাম বলেন, হামলা ও ভাঙচুরে তাঁদের প্রায় ৩১ লাখ টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে অন্তত ৩৫০টি গাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৪০০ জন চালক এবং ফ্লোরে কাজ করা প্রায় ৪০০ কর্মী রয়েছেন বলে জানান তিনি।

ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিন হাজারীবাগ থানায় মামলা করেন। এরপর শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তাঁকে ফোন করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। হুমকিদাতা বলেন, শনিবারের মধ্যে সমঝোতা না করলে তাঁর লাশ পড়ে থাকবে।

বাদীর সঙ্গে হুমকিদাতার কথোপকথনের অডিওতে শোনা যায়, হুমকিদাতা সালাম দিয়ে আফসারকে বলছেন, ‘ভাই, মামলার বাদী যে হলেন, আপনার নিজের মামলার বাদী কে হবেন?’ এ সময় বাদী বলেন, ‘কোনটা ভাই?’ জবাবে হুমকিদাতা বলেন, ‘কোনটা আপনি বোঝেন না?’

এরপর ওই ব্যক্তি অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করেন। তিনি বাদীকে বলেন, ‘কালকের (শনিবার) মধ্যে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করা না হলে লাশ পড়ে থাকবে।’

পরে বাদী ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তোর বাপ বলছি।’ এরপর আবার গালাগাল করে বলেন, ‘কালকের দিন সময় দিলাম, তোর বাপের সঙ্গে কথা বলে ঝামেলা শেষ করতে বল। না হলে সবার আগে তোর লাশ পড়ে থাকবে।’

বাদী নিজে প্রতিষ্ঠানের মালিক নন বলে জানালে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘মালিক না তো বাদী হইছোস কেমনে?’ এরপর ফোন কেটে দেওয়া হয়।

হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, মামলার বাদীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে হুমকিদাতার কথোপকথনের অডিও তাঁকে পাঠানো হয়েছে। অডিওটি যাচাই করা হচ্ছে এবং হুমকির ঘটনাটিও মামলার তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। তবে মূল আসামি সাইফুল ও জুয়েল এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাঁর দাবি, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের নাম ব্যবহার করে তাঁদের নেতৃত্বেই কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয় ও গুদামে হামলা চালানো হয়েছিল। এজেআর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার ঘটনায় করা মামলায় এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

শনিবার বিকালে হাজারীবাগের বড়াইখালীতে প্রতিষ্ঠানটির ডিপোতে গিয়ে দেখা যায়, কার্যক্রম চালু থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। ওয়্যারহাউজের দোতলায় ডিভিআর ও সার্ভার কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুরের চিহ্ন ছিল। পরে সেগুলো নতুন করে সচল করা হয়েছে। নিচতলায় ব্যবস্থাপকের কার্যালয়, কম্পিউটার ও সিসিটিভি ক্যামেরার কক্ষেও ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা যায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে কর্মীদের কাজ করতে হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরোনো ওয়্যারহাউজে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে দুর্বৃত্তরা দুটি বড় কাভার্ডভ্যানও ভাঙচুর করে।

মামলা করার পর বাদীকে হত্যার হুমকির ঘটনা চাঁদাবাজির অভিযোগকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। হুমকি দিতে ব্যবহৃত মোবাইল সিমটি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের একটি চা-বাগানের নারী শ্রমিকের নামে নিবন্ধিত বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সিমটি সংগ্রহের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সিমের নিবন্ধিত ব্যক্তির সঙ্গে হুমকিদাতার প্রকৃত সম্পর্ক কী, তা স্পষ্ট নয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কিছু চক্র রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল বা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গুজব, উসকানিমূলক মাইকিং ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। সুযোগ বুঝে অপরাধী, চাঁদাবাজ, কিশোর গ্যাং বা সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটানো হচ্ছে। তবে এসব অপরাধের মধ্যে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা নির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশিষ্ট নাগরিক, প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ, মোবাইল ফোন কিংবা বেনামি বার্তার মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছেন। এর অনেকগুলো বিদেশি নম্বর থেকে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব তৎপরতার উদ্দেশ্য হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং চলমান আইনি প্রক্রিয়া বা মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত করার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব অভিযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও হুমকির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকের সম্পাদককে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। একই দিনে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে দৈনিক সাঙ্গুর প্রতিনিধি আজগর সালেহীকেও মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে চাঞ্চল্যকর হত্যা, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমন এবং দুর্নীতির মামলার তদন্ত ও তদারকিতে যুক্ত কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও খুলনায় আওয়ামী লীগের সাবেক প্রভাবশালী নেতা বা তাঁদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নম্বর সংগ্রহ করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তাদের ছবি সম্পাদনা করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, কখনো বেনামি ফোনে মামলার গতিপথ পরিবর্তনের চাপ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনের বরাতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি চক্র অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশকে অকার্যকর করার চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে খুলনা শহর ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক খুন, গুলিবর্ষণ, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ উঠলেও প্রতিটি অপরাধের পেছনের কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

সবশেষ শনিবার খুলনার তেরখাদা উপজেলায় প্রকাশ্যে এক স্থানীয় যুবদল নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। এর আগে ২২ অক্টোবর মাত্র ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনার পৃথক দুটি স্থানে গুলিতে দুজন নিহত হন। লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া এলাকায় মায়ের সামনে খুশি বেগম নামের এক তরুণীকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান তুষার নামের আরেক তরুণ।

খুলনায় অপরাধের এসব ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে শনিবার খুলনা বিভাগের কমিউনিটি পুলিশিং সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান চলছে। পুলিশি কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও বেগবান করতে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কমিউনিটি পুলিশিং এখন থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

আইজিপি বলেন, কিছু অপরাধী খুনের শিকার হচ্ছে, আবার কিছু অপরাধী খুন করছে। এসব নিয়ে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কেউ বলছেন, বল প্রয়োগ করা হোক। বল প্রয়োগ করলে দেওয়া হচ্ছে ফ্যাসিস্ট পুলিশের তকমা। আবার বল প্রয়োগ না করলে বলা হয় পুলিশ দুর্বল।

ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে সুপরিকল্পিতভাবে গুজব ও আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর কোনো সুযোগ আমরা দেব না।

তিনি বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশ যখনই কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে যায়, তখন একশ্রেণির পক্ষ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নানা ট্যাগ লাগিয়ে বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আবার কোথাও সামান্য শিথিলতা দেখা গেলে জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এ দুই মুখী চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ডিএমপি অত্যন্ত পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যে কোনো ধরনের উসকানি বা বিশৃঙ্খলা কঠোর হস্তে দমন করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। ডার্ক ওয়েব থেকে কেনা ভার্চুয়াল নম্বর, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন এবং ভিপিএন ব্যবহার করে পরিচয় ও অবস্থান আড়াল করার অভিযোগ রয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো অ্যাপের মাধ্যমে হুমকি দেওয়ার পর নম্বর বন্ধ করে দেওয়ায় অভিযুক্তদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গোয়েন্দাদের ধারণা, ককটেল বিস্ফোরণ বা ঝটিকা মিছিলের তুলনায় ভার্চুয়াল মাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে হুমকি দেওয়া এসব চক্রের কাছে সহজ পদ্ধতি হয়ে উঠেছে। দেশের ভেতরে আত্মগোপনে থেকেও অনেকে একই কৌশলে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দলবদ্ধভাবে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে আত্মগোপনে থাকা কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের কেউ কেউ শীর্ষ পলাতক নেতাদের সঙ্গে অ্যানক্রিপ্টেড অ্যাপে গোপনে যোগাযোগ রাখার এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যের কথা স্বীকার করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

তবে ডিজিটাল মাধ্যমে হুমকি, রাজনৈতিক প্রচার, চাঁদাবাজি এবং সহিংস অপরাধ—এসবের মধ্যে যোগসূত্র নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নম্বর, বার্তা, অডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত যাচাই ছাড়া দায় নির্ধারণ করা কঠিন।

পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের এআইজি কামারুম মুনিরা বলেন, এ ধরনের হুমকির অভিযোগ পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট, ফোন নম্বর, বার্তা, অডিও এবং অন্যান্য ডিজিটাল আলামত যাচাই করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কেউ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে তাকে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ জানাতে এবং হুমকির মূল বার্তা বা অডিও সংরক্ষণ করতে অনুরোধ জানান তিনি।

গুলিবর্ষণ, চাঁদাবাজি, লুটপাট ও প্রাণনাশের হুমকির ঘটনাগুলো তাই শুধু আতঙ্কের পরিবেশের প্রশ্ন নয়; এগুলোর পেছনে কারা রয়েছে, কোথায় অপরাধী চক্রের স্বার্থ জড়িত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ আছে—সেসবও গুরুত্বপূর্ণ। ডিসেম্বরকে ঘিরে যে আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তব কোনো সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ কি না, নাকি পৃথক অপরাধের ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে—তার উত্তর মিলবে নিরপেক্ষ তদন্ত, যাচাইযোগ্য তথ্য ও আইনানুগ পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই।

সূত্র: যুগান্তর

পড়ুন: রোববারই ইরানে হামলা শুরু হতে পারে বললেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন