বাণিজ্যিক সিনেমায় মারপিট, রক্তারক্তি ও নৃশংসতার দৃশ্য এখন বেশ পরিচিত। দর্শকের একাংশের কাছে এসব দৃশ্য আকর্ষণীয় হলেও বলিউড অভিনেত্রী রাধিকা আপ্তের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। পর্দায় একের পর এক মানুষকে নির্মমভাবে মারধর করতে দেখেও দর্শক কীভাবে পপকর্ন খেতে খেতে সিনেমা উপভোগ করেন, তা বুঝে উঠতে পারেন না তিনি। নিজের রুচি ও শিল্পবোধের সঙ্গে এ ধরনের সিনেমার মিল না থাকায় সহিংসতাপ্রধান ছবিতে অভিনয়ের প্রতিও আগ্রহী নন এই অভিনেত্রী।
সম্প্রতি সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিনেমায় সহিংসতার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন রাধিকা। নেটফ্লিক্সের আসন্ন সিরিজ ‘আক্কা’র প্রচারের সময় তিনি জানান, বর্তমানে বড়পর্দায় জনপ্রিয়তা পাওয়া মারকাটারি অ্যাকশনধর্মী সিনেমার প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ নেই। তাঁর মতে, সিনেমার বাজারে সহিংসতা যেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
রাধিকার ভাষ্য, সিনেমায় সহিংসতা দেখানোর ধরন অনেক সময় তাঁর কাছে অদ্ভুত মনে হয়। পর্দায় একসঙ্গে বহু নারী-পুরুষকে মারধর করা হচ্ছে, অথচ দর্শকেরা পপকর্ন খেতে খেতে দৃশ্যগুলো উপভোগ করছেন—এ বিষয়টি তাঁকে ভাবায়। শুধু মারধর নয়, দর্শককে চমকে দিতে কীভাবে আরও ভয়াবহ ও নৃশংস দৃশ্য তৈরি করা যায়, সেই প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
অভিনেত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, সহিংসতার মাত্রা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় গল্প ও সৃজনশীলতার জায়গাটি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। কোনো সিনেমায় কারও মাথা বেসিনের ওপর আছড়ে থেঁতলে দেওয়া হচ্ছে, আবার অন্য দৃশ্যে একই ধরনের নৃশংসতা দেখাতে মাথায় আঘাত করা হচ্ছে অন্য কোনো শক্ত পৃষ্ঠে। এসব দৃশ্যের মধ্যে সৃজনশীলতার কী প্রকাশ রয়েছে, তা তাঁর বোধগম্য নয়।
এ ধরনের সিনেমা নিয়ে নিজের অনাগ্রহের কথা জানিয়ে রাধিকা বলেন, এসব ছবি তাঁর কাছে অদ্ভুত মনে হয়। তাই নিজের অবস্থান ও পছন্দের সঙ্গে আপস করে এমন সিনেমার অংশ হওয়ার চেয়ে দূরে থাকাকেই শ্রেয় মনে করেন তিনি।
রাধিকার এই বক্তব্য বাণিজ্যিক সিনেমায় সহিংসতার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় মারপিট ও রক্তাক্ত দৃশ্য অনেক সময় গল্পের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে দর্শককে আকৃষ্ট করতে নৃশংসতার মাত্রা বাড়ানোর প্রবণতা শিল্পের সৃজনশীলতা ও উপস্থাপনার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে—রাধিকার বক্তব্যে সেই ভাবনারই প্রতিফলন দেখা যায়।
শুধু সিনেমায় সহিংসতা নয়, অভিনয় ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য নিয়েও নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন রাধিকা আপ্তে। মা হওয়ার পর কাজের ক্ষেত্রে তাঁর অগ্রাধিকার বদলেছে। এখন দীর্ঘ সময় শুটিংয়ে কাটানোর পরিবর্তে পরিবার ও মেয়ের সঙ্গে সময় কাটানোকে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি।
রাধিকার মতে, প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা কাজ করার পরিবর্তে ১২ ঘণ্টার মধ্যে শুটিং শেষ করা গেলে ভালো হয়। যদিও চলচ্চিত্র ও সিরিজের কাজের ধরন অনুযায়ী বাস্তবে সব সময় এমনটি সম্ভব হয় না। কাজের চাপ এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি তাঁর কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিনেত্রী জানান, উপযুক্ত কাজ না পেয়ে একসময় অভিনয় থেকে বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। তাঁর কাছে শুধু নিয়মিত কাজ করে যাওয়া কিংবা ক্যারিয়ারে ব্যস্ত থাকাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং যে কাজ তাঁর পছন্দ ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সঙ্গে মানানসই, সেটিকে গুরুত্ব দিতে চান তিনি।
নিজের ভাবনা ব্যাখ্যা করে রাধিকা বলেন, মেয়ের সঙ্গে যতটা সম্ভব সময় কাটাতে চান তিনি। কারণ, জীবন খুব ছোট। কাজ তাঁর জীবনের একটি অংশ, কিন্তু পুরো জীবন নয়। এই উপলব্ধি থেকেই কাজের ক্ষেত্রে নিজের পছন্দ ও সময়ের মূল্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন অভিনেত্রী।
ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি রাধিকা। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনা ও অগ্রাধিকার বদলায়। তাই ভবিষ্যতে তিনি কী করবেন, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
অভিনয় পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া কিংবা নতুন কোনো কাজে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা—দুটিই খোলা রেখেছেন তিনি। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে নিজের জীবন ও কাজের পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে চান এই অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, অভিনয়কে পেশা হিসেবে দেখলেও ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক স্বস্তির গুরুত্ব তাঁর কাছে কম নয়।
রাধিকা আপ্তেকে সামনে দেখা যাবে নেটফ্লিক্সের নতুন সিরিজ ‘আক্কা’তে। আশির দশকের প্রেক্ষাপটে নির্মিত গ্যাংস্টারধর্মী এই সিরিজের গল্প আবর্তিত হয়েছে দুই গ্যাংস্টারের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। এতে রাধিকার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেত্রী কীর্তি সুরেশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৩০ অক্টোবর সিরিজটি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। ফলে সহিংসতাপ্রধান সিনেমা নিয়ে নিজের অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও গ্যাংস্টারধর্মী গল্পের এই সিরিজে রাধিকাকে ভিন্ন এক চরিত্রে দেখা যাবে।
সব মিলিয়ে, রাধিকা আপ্তের বক্তব্যে উঠে এসেছে সিনেমা নির্বাচন, অভিনয়জীবন এবং ব্যক্তিগত অগ্রাধিকার নিয়ে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। জনপ্রিয়তার হিসাবের বাইরে গিয়ে একজন শিল্পী নিজের রুচি ও মূল্যবোধ অনুযায়ী কাজ বেছে নিতে পারেন—তাঁর অবস্থান সেই বিষয়টিই সামনে এনেছে। একই সঙ্গে পরিবারকে সময় দেওয়া এবং কাজের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন এই অভিনেত্রী।
পড়ুন:মাত্র ৯৯৯ টাকা দেনমোহরে বিয়ে সারলেন নাট্যশিল্পী সুজাত শিমুল
ইমি/


