কপালে লাল ফিতা বাঁধা, পরনে হলুদ রঙের টি-শার্ট আর কালো প্যান্ট। বয়স সবে পাঁচ বছর। যে বয়সে সমবয়সী অন্য শিশুদের সময় কাটে নানা রকম খেলনা কিংবা দুরন্তপনায়, সেই বয়সেই গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার কৌশল রপ্ত করতে ব্যস্ত ছোট্ট আজমাইন। তার এক হাতে যেমন রয়েছে পড়াশোনার বই-খাতা, তেমনি অন্য হাতে সগর্বে উঠে এসেছে ঐতিহ্যের লাঠি। দাদার হাত ধরে প্রশিক্ষণের মাঠে পা রাখা এই খুদে লাঠিয়ালের নৈপুণ্য আর আগ্রহ এখন নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুরা ইউনিয়নের কেবলপুর গ্রামের মানুষের মুখে মুখে।
কেবলপুর গ্রামের শাহ আলমের ছেলে আজমাইন। তার ব্যতিক্রমী আগ্রহের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তার ৫৩ বছর বয়সী দাদা চান মিয়া। দাদা নিজেও ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার একজন অনুরাগী। নাতির মধ্যে ছোটবেলা থেকেই খেলার প্রতি প্রবল ঝোঁক ও কৌতূহল লক্ষ্য করেন তিনি। তাই আর দেরি না করে আজ থেকে প্রায় ছয় মাস আগে নাতির হাত ধরে নিয়ে যান একই এলাকার অভিজ্ঞ লাঠিখেলা প্রশিক্ষক চান মিয়া খানের কাছে। সেই থেকেই দাদার সঙ্গী হয়ে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করে আজমাইন।
প্রতিদিনের স্কুলের পড়াশোনা আর শৈশবের স্বাভাবিক ব্যস্ততার ফাঁকে সময় পেলেই সে মেতে ওঠে লাঠি ঘোরানোর অনুশীলনে। লাঠির নানা কৌশল আয়ত্ত করা এবং বয়সে বড় খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মহড়া দেওয়াতেই যেন তার যত আনন্দ।
সম্প্রতি লেংগুরা ইউনিয়ন বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে স্থানীয় সাত শহীদ মাজার সড়কে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সেই আয়োজনে লাঠিয়াল দলের সদস্যদের সঙ্গে উপস্থিত ছিল ছোট্ট আজমাইনও। দলের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা যখন লাল-হলুদ রঙের বিশেষ পোশাক ও পায়ে ঘুঙুর বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে লাঠির কসরত দেখাচ্ছিলেন, তখন সবার সামনে দাঁড়িয়ে গোলাপি রঙের লাঠি হাতে নিজের কৌশল প্রদর্শন করে আজমাইন। তার ছোট্ট হাতের নিপুণ লাঠি ঘোরানোর দৃশ্য উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং সবার বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আধো বুলিতে ছোট্ট আজমাইন জানায়, দাদার সঙ্গে গিয়ে লাঠিখেলা শিখতে এবং খেলতে তার ভীষণ ভালো লাগে।
নাতির এমন আগ্রহে দারুণ খুশি দাদা চান মিয়া। গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকুক- এমনটাই তার চাওয়া।
দাদা চান মিয়া বলেন, “আমার নাতির বয়স মাত্র পাঁচ বছর। পড়াশোনার পাশাপাশি সে লাঠিখেলা শিখছে, তা দেখে আমার খুবই ভালো লাগে। আমি চাই সে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করুক, আর এর পাশাপাশি আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর সঙ্গেও পরিচিত হয়ে উঠুক। লাঠিখেলা কেবল নিছক বিনোদন নয়, এর সঙ্গে আমাদের গ্রামের পুরোনো শিকড় ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। নতুন প্রজন্ম এই খেলাটিকে জানুক এবং শিখুক- এটাই আমার একান্ত প্রত্যাশা।”
আজমাইন যে দলটির হয়ে অনুশীলন করে, সেখানে বিভিন্ন বয়সের ১৩ জন সদস্য রয়েছেন। বয়স ও অভিজ্ঞতার বিস্তর ফারাক থাকলেও গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তাঁদের সবাইকে একই সুতোয় গেঁথেছে। দলের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে বড়দের স্নেহ ও সাহচর্যে খুব কাছ থেকে খেলার নানা দিক ও কৌশল রপ্ত করার সুযোগ পাচ্ছে আজমাইন।
লাঠিখেলার প্রশিক্ষক চান মিয়া খান জানান, মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি নিজে এই খেলা শিখেছিলেন এবং তখন থেকেই এর প্রতি তার গভীর ভালোবাসা জন্মায়। বর্তমানে নিজ এলাকায় এই খেলার চর্চা টিকিয়ে রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রশিক্ষক চান মিয়া খান বলেন, “আমাদের ১৩ সদস্যের দলে পাঁচ বছরের আজমাইনও রয়েছে। এত কম বয়স থেকে কেউ যখন ঐতিহ্যবাহী এই খেলাটি শিখতে আগ্রহ দেখায়, তখন একজন প্রশিক্ষক হিসেবে তা সত্যিই আনন্দের। আমাদের লক্ষ্য হলো এলাকার ছেলেমেয়েরা যেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি দেশীয় খেলাধুলা ও নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে জানে। নিয়মিত চর্চা এবং স্থানীয় সবার সহযোগিতা পেলে আমরা আমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাটিকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।”
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যেখানে গ্রামীণ খেলাধুলা ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে, সেখানে কেবলপুর গ্রামের দাদা-নাতির যুগলবন্দি এবং পাঁচ বছরের শিশু আজমাইনের লাঠিখেলার চর্চা স্থানীয়দের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
পড়ুন : টাঙ্গাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন


