একটি বিমানবন্দর, একটি টিকিট, আর একটি ঘোষণা। শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন, এমন কথা বলেছেন, কিন্তু সেই যাত্রার কোনো চিহ্ন এখনো দৃশ্যমান নয়। যিনি একসময় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় ছিলেন, তিনি এখন বিদেশে বসে মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে নিজের দেশে ফেরার কথা বলছেন। প্রশ্নটি তাই শুধু একজন নেতার ফেরার নয়, বরং এই ঘোষণা কতটা বাস্তব, সেই হিসাবের।
রাজনীতির মানুষ ঘোষণা দেন, আর সেই ঘোষণা সবসময় বাস্তবে রূপ পায় না। তবু ঘোষণাটি যখন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে আসে, তখন তা উপেক্ষা করা যায় না।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরবেন, আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও তাঁর সঙ্গে আত্মসমর্পণ করবেন। পরে একটি অডিও বক্তব্যেও তিনি একই কথা বলেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা থাকলেও স্বেচ্ছায় ফেরা তাঁর দায়িত্ব। কথাগুলো শুনতে সাহসের মতো লাগে। কিন্তু সাহস আর পরিকল্পনা এক জিনিস নয়। সেখানেই আসল প্রশ্ন। আত্মসমর্পণের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত সাধারণত অনেক আগে থেকে প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে যায়। আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা হয়, নিরাপত্তার ব্যবস্থা ভাবা হয়, আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে, আর ফেরার পথের কূটনৈতিক বাস্তবতাও মেনে নেওয়া হয়।
হাসিনা নিজেই জানিয়েছেন, ফেরার সময় নিয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়নি এবং ঢাকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়নি। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৃশ্যমান প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক সমঝোতা না থাকায় আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। যাঁরা দলের ভেতরে থেকে এই রাজনীতি করেন, তাঁরাই যদি ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে এমন সংশয়ে থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন করাটা অস্বাভাবিক নয়।
এই প্রশ্নগুলোর পেছনে আছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ভয়াবহ দিনগুলো। ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে যা একসময় সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়, সেই সময়ে বহু মানুষের প্রাণ গেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে ১ হাজার ৪০০ জন পর্যন্ত মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, নিহত ও আহতদের বিশাল অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে হতাহত হয়েছেন, এবং উচ্চ পর্যায় থেকে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ এসেছিল।
এই পরিস্থিতিতেই ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও দণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠায়। নয়াদিল্লি অনুরোধ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে, কিন্তু এখনো তা হস্তান্তর করেনি। জুলাইয়েও ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি “পরীক্ষাধীন”। দুই দেশের মধ্যে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে, তবু এই অনুরোধ কেবল আইনি নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাবেরও বিষয়। ভারত চাইলে যুক্তি দিতে পারে যে বিচারপ্রক্রিয়ায় বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি ছিল, কিংবা রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রত্যর্পণের অনিশ্চয়তা সহজে কাটবে বলে মনে হয় না।
এখানেই হাসিনার ঘোষণার সবচেয়ে বড় অসংগতিটি চোখে পড়ে। তিনি একদিকে আত্মসমর্পণের কথা বলছেন, অন্যদিকে রায়কে আইনত অকার্যকর বলছেন। আত্মসমর্পণের অর্থ হলো আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পক্ষ তুলে ধরা। যিনি আদালতের বৈধতাই মানেন না, তাঁর আত্মসমর্পণ কতটা আন্তরিক, সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে। এই কারণেই ঘোষণাটিকে অনেকেই আইনি প্রস্তুতির চেয়ে রাজনৈতিক বার্তার মতো দেখছেন। সমর্থকদের মনোবল ধরে রাখা, দলকে সংগঠিত রাখা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া, এই তিনটি উদ্দেশ্যই এখানে স্পষ্ট।
তবু নিরপেক্ষভাবে দেখতে গেলে বিপক্ষের যুক্তিও শোনা দরকার। ব্রিটিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান অনুপস্থিতিতে বিচারের ধরন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। ন্যায্য বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, পূর্বদিনের প্রভাবে অপরাধ নির্ধারণ এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি নিয়ে বিশ্লেষকেরাও এই ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বক্তব্য, তাদের অনেক নেতা-কর্মী মামলা, গ্রেপ্তার ও হামলার শিকার হচ্ছেন। দলের কিছু সদস্য রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস পেলে ফিরতে প্রস্তুত বলেও জানা যায়। এই অভিযোগগুলো যাচাই করা দরকার। তবে একটি পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি। শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রমাণসাপেক্ষ জবাবদিহি এক কথা, আর সাধারণ কর্মী বা সমর্থককে সমষ্টিগতভাবে দায়ী করা সম্পূর্ণ আলাদা কথা। প্রথমটি ন্যায়বিচারের অংশ, দ্বিতীয়টি নতুন অবিচারের জন্ম দিতে পারে।
তাহলে ডিসেম্বরের এই পরীক্ষায় কী জরুরি? আমার কাছে কয়েকটি বিষয় সবার আগে মনে হয়। যদি হাসিনা সত্যিই ফেরেন, তাঁর উপস্থিতিতে আপিল বা পুনর্বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অনুপস্থিতিতে দেওয়া রায়ের ত্রুটি দূর করার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য উপায় এটিই, এবং এতে রায়ের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে। বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক থাকলে ফলাফল যা-ই হোক, প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন কমবে।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক মেটাতে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য তালিকা প্রকাশ জরুরি, যাতে কোনো পক্ষই তথ্যের অভাবের অজুহাত দিতে না পারে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ ও সত্য উদ্ঘাটনের আলাদা উদ্যোগও দরকার, কারণ বিচারের পাশাপাশি স্বীকৃতি ছাড়া ক্ষত সারে না। সবশেষে, ভারতের সঙ্গে আইনি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রাখতে হবে, যাতে প্রত্যর্পণের প্রশ্ন দুই দেশের অন্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব না ফেলে।
যাঁরা এই দেশের রাজনীতি কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা জানেন, এখানে প্রতিটি ঘটনার পর দুটো শিবির তৈরি হয়। একদিকে যাঁরা হাসিনার ফেরাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদ বলে দেখেন, অন্যদিকে যাঁরা এটিকে বিচার এড়ানোর চেষ্টা বলে মনে করেন। এই দুই শিবিরের মাঝখানে যে মানুষেরা বাস করেন, তাঁরা চান শুধু একটি জিনিস: নিরাপদ জীবন, সত্যের স্বীকৃতি, আর এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ক্ষমতা হারানোর পর কেউ দায় এড়াতে পারবে না, আবার ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেও কেউ নিরঙ্কুশ থাকবে না। এই আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি দলের নয়, এটি সমগ্র জাতির।
ডিসেম্বরে হাসিনা সত্যিই ফিরবেন কি না, তা আজ নিশ্চিত করে বলা যায় না, আর যে বিষয়ে আজ এত অনিশ্চয়তা, সে বিষয়ে জোর দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করাও ঠিক নয়। তবে এখনকার দৃশ্যমান প্রস্তুতির অভাব, ভারতের নীরবতা এবং ঘোষণার ভেতরের অসংগতি বিবেচনায় নিলে ফেরার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত, সেটুকু বলা যায়।
কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা প্রতিশোধের নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে চলে? নিহতদের পরিবার যদি বিচার পায়, আর অভিযুক্ত যদি ন্যায্য শুনানির সুযোগ পান, তবেই এ দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে পারবে যে ক্ষমতার অপব্যবহারের হিসাব একদিন দিতেই হয়। ডিসেম্বর আসুক বা না আসুক, সেই পরীক্ষার দিন আসলে অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।
পড়ুন : বিমানবন্দর কার: সুবিধার নাকি যন্ত্রণার?


