গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ ও মৌচাক এলাকা।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া শ্রমিক বিক্ষোভ একপর্যায়ে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে রূপ নেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় বিজিবি সদস্য, পুলিশ, সাংবাদিক ও বিএনপির নেতাকর্মীসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
টানা পাঁচ ঘণ্টা অবরোধের পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ ও মৌচাক এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
একপর্যায়ে শ্রমিকরা মহাসড়কের উভয় পাশে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গগামী হাজার হাজার যানবাহন আটকা পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিজিবি সদস্যরা মাঠে কাজ করেন। সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে বিজিবি সদস্য, পুলিশ, সংবাদকর্মী এবং বিএনপির নেতাকর্মীসহ অন্তত ১০ জন আহত হন বলে জানা গেছে। তবে আহতদের নাম-পরিচয় ও তাঁদের চিকিৎসার বিস্তারিত তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে সকাল থেকে মহাসড়ক অবরোধ থাকায় চন্দ্রা থেকে মৌচাক পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ঢাকা ও উত্তরবঙ্গগামী দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন আটকা পড়ে।
এতে যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক, কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ পথচারীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। জরুরি কাজে বের হওয়া অনেক মানুষও দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকেন।
টানা পাঁচ ঘণ্টা অবরোধ, সংঘর্ষ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর শ্রমিকরা মহাসড়ক থেকে সরে গেলে ধীরে ধীরে যান চলাচল শুরু হয়। পরে আটকে থাকা যানবাহন চলাচল করতে শুরু করলে মহাসড়কে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
অন্যদিকে, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তবে এরপরও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের মাসিক বেতন বৃদ্ধি করতে হবে।
শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে একদিকে যেমন শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা বিরাজ করছে, অন্যদিকে মহাসড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীদের দাবি, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনার পাশাপাশি মহাসড়কে জনদুর্ভোগ বন্ধে সরকার, কারখানা মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
লিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করেছে। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফকরুল হোসাইন বলেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জনসাধারণের দুর্ভোগ ও শিল্পকারখানার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।
পড়ুন : পূর্বধলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে মদ্যপ অবস্থায় যুবকের সাজা


