সংবাদে সত্য তুলে ধরা, অসংগতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা আর ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা—সাংবাদিকতার এসব দায়িত্ব পালনে নৈতিকতার ভিত্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তুলে ধরেছেন কুরআন পাঠ আন্দোলনের আহ্বায়ক আবু সাঈদ খান। তাঁর মতে, সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা চর্চায় কুরআনের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তাই সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি কুরআন পাঠ ও অনুধাবনের চর্চাও গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যায় মাদারীপুর প্রেস ক্লাবে কুরআন পাঠ আন্দোলনের উদ্যোগে ‘কুরআনের আলোকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন মাদারীপুর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বেলাল রিজভী। এতে জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আবু সাঈদ খান বলেন, কুরআন শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য পাঠ করার গ্রন্থ নয়; এটি মানুষের জীবন, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়। বিশেষ করে সাংবাদিকদের কাজের সঙ্গে এর শিক্ষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ, একজন সাংবাদিককে প্রতিনিয়ত সত্য-মিথ্যা যাচাই, তথ্যের যথার্থতা নিরূপণ এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো তুলে ধরতে হয়।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁদের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, জবাবদিহির আওতায় আনেন। একইভাবে আল্লাহ তাআলাও মানুষের প্রতিটি কাজ সম্পর্কে অবগত। প্রত্যেক মানুষকে তাঁর কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। এই বোধ থেকেই একজন সাংবাদিকের দায়িত্বশীলতা ও নৈতিক অবস্থান আরও দৃঢ় হওয়া প্রয়োজন।
দেশের সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে আবু সাঈদ খান বলেন, ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে অনেক সময় সংঘাত, হানাহানি ও উগ্রতার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ধর্মের নামে কেউ অপব্যাখ্যা, উসকানি কিংবা বিভ্রান্তি ছড়ালে তা চিহ্নিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের শুধু ঘটনার বিবরণ প্রকাশ করলেই চলবে না, ঘটনার পেছনের সত্যও অনুসন্ধান করতে হবে। ধর্মীয় বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান থাকলে সাংবাদিকেরা আরও দায়িত্বশীলভাবে এসব বিষয় তুলে ধরতে পারবেন।
কুরআনের বিভিন্ন শিক্ষার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সত্য গোপন করা, মিথ্যার সঙ্গে সত্য মিশিয়ে দেওয়া কিংবা যাচাই না করে কোনো তথ্য প্রচার করা নৈতিকতার পরিপন্থী। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্যনিষ্ঠা, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থ। কুরআনের শিক্ষার সঙ্গেও এসব মূল্যবোধের সামঞ্জস্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকতা সমাজ ও রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত। এই পেশার মানুষ যদি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মানবকল্যাণকে প্রাধান্য দেন, তাহলে তাঁদের কাজ শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৃহত্তর মানবকল্যাণেও ভূমিকা রাখবে। সত্যনিষ্ঠ ও জনকল্যাণমুখী সাংবাদিকতা ইবাদতের মর্যাদাও লাভ করতে পারে।
আলোচনার একপর্যায়ে মাদারীপুর প্রেস ক্লাবে নিয়মিত কুরআন পাঠের চর্চা চালুর আহ্বান জানান আবু সাঈদ খান। সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পেশাগত পরিসরেও কুরআনের শিক্ষা চর্চার অভ্যাস গড়ে তোলার অনুরোধ জানান তিনি।
সভায় কুরআন পাঠ আন্দোলনের উপদেষ্টা মুরাদ বিন আমজাদ বলেন, কুরআন কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, পেশা কিংবা গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়। মানবজাতির প্রত্যেক মানুষেরই এ গ্রন্থ পাঠ, অনুধাবন ও শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি বিভিন্ন আয়াতের আলোকে কুরআন পাঠের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন এবং সাংবাদিকদের দৈনন্দিন জীবনে এ চর্চা যুক্ত করার আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সাংবাদিক নেতৃবৃন্দও বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। আলোচনার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন করেন তাঁরা। আবু সাঈদ খান প্রশ্নগুলোর উত্তর দেন এবং কুরআনের আলোকে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন।
সভাপতির বক্তব্যে মাদারীপুর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বেলাল রিজভী কুরআন পাঠ আন্দোলনের উদ্যোগকে ব্যতিক্রমী ও প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জাতির কল্যাণে কুরআনকে কেন্দ্র করে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তিনি আবু সাঈদ খানকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানান। ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের মতবিনিময় ও কার্যক্রম আয়োজনের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
কুরআনের শিক্ষা, সাংবাদিকতার নৈতিকতা এবং সত্যনিষ্ঠ সংবাদচর্চার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা ও পারস্পরিক মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে সভার সমাপ্তি হয়।
পড়ুন : কসবায় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের কর্মসূচিতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ


