বিজ্ঞাপন

বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক ঝুঁকি ও ভারত–পাকিস্তান চুক্তির প্রাসঙ্গিকতা: এনডিটিভির বিশ্লেষণ

বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনায় যে কোনো ধরনের হামলা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। ভিয়েনাভিত্তিক এই সংস্থার প্রধানের মতে, আধুনিক সংঘাতে বেসামরিক পারমাণবিক অবকাঠামো ক্রমশই সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।

বিশ্লেষণে বলা হয়, একসময় যুদ্ধের মধ্যেও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গবেষণা স্থাপনাগুলোকে অক্ষত রাখা হতো। কিন্তু বর্তমানে ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া কেন্দ্র থেকে শুরু করে ইরানের নাতাঞ্জ, ফোর্ডো ও ইস্ফাহান স্থাপনাগুলোর ওপর হামলার ঘটনা এই ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। এসব ঘটনায় পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ইরানের বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ চুল্লির নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অতীতেও ইরাক ও সিরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ঝুঁকিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গবেষণার উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও এগুলোর ওপর হামলা হলে ব্যাপক তেজস্ক্রিয় বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকে, যা কোনো দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না।

আইএইএ প্রধান গ্রোসি বলেন, এসব ঝুঁকি বাস্তব এবং তাৎক্ষণিক। সংস্থাটি শুধু সতর্কবার্তা নয়, বরং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সরাসরি উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে ইউক্রেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় আইএইএ বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়।

এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিন দশকের পুরোনো একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ১৯৮৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত এবং ১৯৯১ সালে কার্যকর হওয়া এই চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশ একে অপরের পারমাণবিক স্থাপনায় কোনো ধরনের হামলা চালাবে না বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও বেনজির ভুট্টোর উদ্যোগে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় প্রতি বছর ১ জানুয়ারি দুই দেশ পারমাণবিক স্থাপনার তালিকা বিনিময় করে। ১৯৯২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে চলমান এই প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত ৩৫ বার সম্পন্ন হয়েছে।

এই তালিকায় উভয় দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গবেষণা স্থাপনা ও অন্যান্য সংবেদনশীল অবকাঠামোর তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর ফলে সম্ভাব্য সংঘাতের পরিস্থিতিতেও ভুলবশত হামলার ঝুঁকি কমে যায় বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক ডি বি ভেঙ্কটেশ ভার্মা এই চুক্তিকে বিশ্বে অনন্য আস্থা-নির্মাণকারী উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একইভাবে সাবেক রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আকবরউদ্দিন এটিকে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির একটি বিরল ও কার্যকর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্লেষণে বলা হয়, চরম বৈরিতা ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও ভারত ও পাকিস্তান কখনোই একে অপরের পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেনি। এই সংযম দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি স্থিতিশীল উপাদান হিসেবে কাজ করছে।

আইএইএ প্রধান গ্রোসি সতর্ক করে বলেন, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা নিষিদ্ধ করার আন্তর্জাতিক নীতি থাকলেও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তবে তিনি মনে করেন, ঝুঁকি হ্রাসে বিদ্যমান আঞ্চলিক চুক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত–পাকিস্তান মডেল প্রমাণ করে যে চরম শত্রুতার মধ্যেও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পারস্পরিক সংযম বজায় রাখা সম্ভব। তবে এটি কাশ্মীরসহ অন্যান্য রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান নয়, বরং একটি সীমিত কিন্তু কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো।

সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক সংঘাতে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর বাড়তে থাকা ঝুঁকির মধ্যে ভারত–পাকিস্তানের এই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এখন আন্তর্জাতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পড়ুন: স্বর্ণের বাজারে বড় ধস, কেন এই দরপতন?

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন