কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আটক তুহিনের বাড়ি থেকে তার মায়ের হারিয়ে যাওয়া আইফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে পুলিশ গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা যাওয়া কিশোরের বাড়ি থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা আইফোনটি উদ্ধার করেছেন। মায়ের ওই আইফোন নিয়ে বের হওয়ার পরই নিখোঁজ হয়েছিল অপ্রতিম।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য ও আলামতে অপ্রতিমকে ওই আইফোনের জন্যই হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে—এমন বিষয় অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে। তবে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করছিল। একটি ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরকে দেখা যায়। অপ্রতিমের চেয়ে বয়সে বড় ওই কিশোরের মাথায় ক্যাপ ছিল। ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে তার গতিবিধি দেখে সন্দেহ হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। পরে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি একটি বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজেও অপ্রতিমকে নিয়ে যেতে দেখা যায় ওই কিশোরকে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ওই কিশোরের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা। লাশ উদ্ধারের আগে তারা ওই কিশোরের বাড়িতেও যান। পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। শনিবার দুপুরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর কোটবাড়ি এলাকা থেকে ওই কিশোরকে আটক করে ডিবি পুলিশ।
তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাত ৮টার দিকে সালমানপুর এলাকায় তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
তুহিনের বিরুদ্ধে বাইক চুরির অভিযোগ
অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক তুহিনের বিরুদ্ধে বাইক চুরির অভিযোগ করেছেন আসাদুল্লা সোহাগ (২১) নামের এক তরুণ।
শনিবার তুহিনের আটকের খবর পাওয়ার পর নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দেন সোহাগ। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, তাকেও একইভাবে ডেকে নিয়ে তার বাইক নিয়ে গিয়েছিল তুহিন। এ ঘটনায় পুলিশের কাছে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে আসাদুল্লাহ সোহাগ উল্লেখ করেন, চোর তুহিন থেকে আজকে সে খুনি তুহিন! সে আমাকেও একইভাবে ডেকে এনে কৌশলে আমার বাইকটি নিয়ে যায়। ওর বিরুদ্ধে যখন আমি মামলা করতে গিয়েছিলাম, তখন সদর দক্ষিণ থানার পুলিশ আমার মামলা না নিয়ে শুধু একটা জিডি নিয়েছিল। কিন্তু ওর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আমাদের বলেছিল—ওর মাথার ওপর নাকি কোনো এক রাজনৈতিক দলের বড় নেতার হাত আছে, তাই ওকে যেন কিছু না করা হয়! আমি সেদিন চুপ ছিলাম, কিন্তু আজ বলব—দেশের পুলিশের শুধু পোশাকই পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্র নয়! টাকা ছাড়া এই দেশে কোনো কিছুর বিচার পাওয়া যায় না। আমার বাইক চুরি গেছে, সেটা নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। কিন্তু আমি মনে করি, ছোট অপরাধ পার পেয়ে গেলেই অপরাধীরা পরবর্তীতে বড় অপরাধ করার সাহস পায়। সেদিন যেই নেতার পাওয়ার দেখিয়ে ওকে আইন থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, আজ ওকে কীভাবে বাঁচাবেন?
পোস্টের সঙ্গে একটি অভিযোগপত্রের ছবি, চুরি যাওয়া বাইকের ছবি, তুহিনের ছবি এবং একটি ফটোকার্ড সংযুক্ত করেন তিনি।
এদিকে তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধারের কথা জেলা পুলিশের একটি গোপন সূত্র জানিয়েছে। তবে এ বিষয়ে কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার বিষয়ে রোববার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে জেলা পুলিশ। আইফোনের জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় তুহিন ও আনাস ছাড়াও ফাহিম নামে আরও একজনকে আটক করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শনিবার রাত পৌনে ১২টা পর্যন্ত প্রশাসনের কেউ ফাহিমের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
নিখোঁজের পর ঝোপ থেকে উদ্ধার মরদেহ
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিম। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর আর বাসায় ফেরেনি সে। পরে তার বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন।
নিখোঁজের পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের পাশে লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা গ্রামের ঝোপ থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
এ ঘটনায় তুহিন নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ। পরে বিকেলে আনাস নামের আরও একজনকে এসআরবি আটক করেছে বলে জানা গেছে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
‘আমার তো একটাই ছেলে, ওকে ছাড়া জীবন পার করব কীভাবে’
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর আহাজারি করতে গিয়ে তার মা ড. নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে আমি জানতে চাই, আমাকে জবাব দেন। আমি এই কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটাই কি আমার অন্যায়? আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি শুধু সেটার জবাব চাই।’
শনিবার দুপুরে কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকায় ড. নাহিদা বেগমের বাসায় যান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় তার কাছে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলেন নাহিদা বেগম।
তিনি বলেন, এটা কোন দেশ? আমি বাঁচব কীভাবে? আমার তো একটাই ছেলে। কীভাবে আমার জীবন কাটাব? আপনারা সবাই বলেন, ওকে ছাড়া আমি আমার জীবন পার করব কীভাবে?
এ সময় ড. নাহিদা বেগমের কান্না দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনিও কেঁদে ওঠেন। পরে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেন তিনি।
অপ্রতিমের মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেছিলেন। পরদিন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হত্যার ঘটনায় তুহিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আইফোনের জন্যই তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনার বিষয়ে রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে জেলা পুলিশ।
পড়ুন : রাজধানীর মিরপুরে ও বাড্ডায় বাসে আগুন
সা/


