ইয়েমেনে সেনা প্রশিক্ষণ শিবিরে হুথিদের হামলা, ৫৮ জন নিহত

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশে সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৫৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ এবং নিখোঁজ রয়েছেন ১৪ জন। শাবওয়ার গভর্নর আওয়াদ আল ওয়াজির হতাহতের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সোমবার সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ মহড়া চলার সময় এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের যাচাই করা একটি ভিডিওতে হামলার পর ঘটনাস্থলে হতাহতদের পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ভিডিওতে মাটিতে আহত মানুষ ও রক্তমাখা মরদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার দৃশ্য উঠে এসেছে। এতে হামলার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, প্রশিক্ষণ শিবির লক্ষ্য করে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে হুথি বিদ্রোহীরা। তবে হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন এবং হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে বিস্তারিত যাচাইয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।

হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহইয়া সারী জানান, তাদের বাহিনী ওই প্রশিক্ষণ শিবিরটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। তার দাবি, শিবিরটি সৌদি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে সৌদি আরবের সরকার বা সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। চলতি মাসে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকারের সেনাবাহিনী হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের অভিযান শুরু করেছে। এ অভিযানে বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি কয়েকটি এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে সরকারি বাহিনী।

অন্যদিকে, হুথিরা দক্ষিণাঞ্চলের তাইজ শহর অবরুদ্ধ করে রেখেছে। শহরটি হুথিবিরোধী শক্তির গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেনের দক্ষিণ-মধ্য উপকূলীয় অঞ্চল শাবওয়া জ্বালানি সম্পদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এডেন উপসাগরের তীরবর্তী এ প্রদেশে অবস্থিত বালহাফ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনকেন্দ্র, যা দেশটির অন্যতম বৃহৎ শিল্প বিনিয়োগ। এ কারণে অঞ্চলটির নিরাপত্তা ইয়েমেনের অর্থনীতি ও জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া বাব আল-মান্দেব প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। এ অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে।

গত সেপ্টেম্বরে হুথি বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির কাছাকাছি এলাকায় অগ্রসর হওয়ার পর থেকে তাদের সঙ্গে সৌদি সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীর পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

ইয়েমেনের সংঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান বিরোধের প্রেক্ষাপটে হুথিদের সামরিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও সামনে এসেছে।

২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে নিলে ইয়েমেনের সংঘাত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। সরকারকে দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে হয়। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হস্তক্ষেপ করলে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত থাকায় দেশটিতে অস্থিতিশীলতা রয়ে গেছে।

দীর্ঘদিনের যুদ্ধের কারণে ইয়েমেন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে রয়েছে। সংঘাত, খাদ্যসংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতায় লাখো মানুষ দুর্ভোগের শিকার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা সতর্ক করেছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

শাবওয়ার প্রশিক্ষণ শিবিরে সাম্প্রতিক হামলায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি এবং নিখোঁজ থাকার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হতাহতদের উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এ হামলার জেরে ইয়েমেনের বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় কি না, তা নিয়ে নজর রাখছেন পর্যবেক্ষকেরা।

পড়ুন:খুব শিগগির প্যারিস মুসলিম শহরে পরিণত হবে’: ট্রাম্প

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন