বিজ্ঞাপন

বিপিসির চেয়ারম্যান হতে গোপন চুক্তি লাবলুর রহমানের, বেবিচক জুড়ে তোলপাড়

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এর চেয়ারম্যান হতে তিনি এক দালাল চক্রের সঙ্গে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি করেছেন। নিজের পরিচয় তুলে ধরে দিয়েছেন সম্মতিপত্র। ফাঁস হওয়া চুক্তিতে কোন টাকার কথা উল্লেখ না থাকলেও সেখানে বিপিসি চেয়ারম্যান হতে যে চুক্তি, সেটি ‍উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টি ফাঁস হওয়ায় পুরো বেবিচক জুড়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। বেবিচকের ইতিহাসে উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার এমন ঘটনা নজিরবিহীন।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর আওয়ামী ঘেঁষা কর্মকর্তা চিহ্নিত করে যে কয়েকজন কর্মককর্তাকে প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল তার মধ্যে এস এম লাবলুর রহমান ছিলেন অন্যতম। তার বিরুদ্ধে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুদকের মামলাও রয়েছে । একই সঙ্গে নানা অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রীর নিকট অভিযোগ দায়ের করাও রয়েছে।

তবে গুরুতর এ অভিযোগ বিষয়ে জানতে এস এম লাবলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ফাঁস হওয়া চুক্তিটি এ প্রতিবেদকের নিকট আসে। তা যাছাই বাছাই করা হয়। বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা চুক্তিটি যে তারই এ বিষয়ে মতামত দেন। কেননা চুক্তিতে যে সকল তথ্য দেয়া হয়েছে তা সব এসএম লাবলুর রহমানের। এত তথ্য অন্য কোন লোকের নিকট থাকার কথা নয়। তার দূর্নীতি অনিয়মে এই চুক্তির ঘটনা সত্য বলে তারা তুলে ধরেন।

ফাঁস হওয়া চুক্তিতে প্রথমপক্ষ হিসেবে এসএম লাবলুর রহমানের নাম দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে ফাহাদ হোসেন সাগরের নাম রয়েছে। উভয়েরই পূর্ণ ঠিকানা একই সঙ্গে নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর উল্লেখ রয়েছে। বিপিসি চেয়ারম্যান হতে যে চুক্তি তা তাতে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি বিপিসি চেয়ারম্যান হতে পারলে প্রথম পক্ষ এস এম লাবলুর রহমান দ্বিতীয় পক্ষ ফাহাদ হোসেনকে টাকা দেবেন সেটিও উল্লেখ রয়েছে।

একই সঙ্গে তিনি বিপিসি চেয়ারম্যান হতে আগ্রহী। সরকার তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করলে তার কোন আপত্তি থাকবেনা বলে উল্লেখ করে সম্মতি পত্রও দিয়েছেন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লাবলুর রহমানের ক্ষমতার মূল উৎস ছিল তার মেজো বোন মনিরা পারভীনের রাজনৈতিক প্রভাব, যিনি পঞ্চগড় জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। মনিরা পারভীন মূলত প্রভাবশালী শেখ হেলালের আস্থাভাজন ছিলেন। বড় বোনের রাজনৈতিক প্রভাবেই লাবলুর রহমান আনসার ক্যাডার (১৯৯৫ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আনসার ক্যাডারে ছিলেন) থেকে ২০১৩ সালে প্রশাসন ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত হন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক নিয়োগ বাণিজ্য করেন । মনিরা পারভীনের মেয়ে তামান্না জ্যোতি গাজীপুরের একটি উপজেলায় ইউএনও হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং ৫ই আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশত্যাগ করেছেন। লাবলু রহমান ও তার পরিবার আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এই সিন্ডিকেটটি দীর্ঘসময় ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে দুর্নীতি চালিয়ে গেছে। ১৯৯৫ সালে আনসারের তৎকালীন মহাপরিচালকের পিএস থাকাকালীন সময়েও তার বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

সেতু বিভাগে চার বছর ডেপুটি সেক্রেটারি ও জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই লাবলুর রহমানের দুর্নীতির ভিত্তি মজবুত হয়। বিশেষ করে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ডিপিডি হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেন। যার ফলে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার নামে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা দায়ের করা হয় এবং সেতু মন্ত্রণালয় তাকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার বোনের আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার সুবাদে শেখ হেলালকে দিয়ে সুপারিশ করিয়ে ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সিভিল এভিয়েশনে বদলি হন লাবলুর রহমান।এরপর থেকে দেড় বছর মেম্বার ফাইন্যান্স থাকাকালীন তিনি প্রতিটি ব্যাংক থেকে শতকরা ১ ভাগ কমিশন নিয়ে সরকারি ফান্ডের এফডিআর দিতেন।

তৎকালীন এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিবি প্রধান কৃষ্ণ পদ রায় এবং ডিএমপির যুগড়্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের মতো উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা ভোগ করে এসেছেন। এছাড়া তিনি আওয়ামী লীগ শাসনামলে ১৫তম বিসিএস ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে সাত বছর দায়িত্ব পালন করেন। বিগত ১৯৮৯ সালে সেনাবাহিনীর ট্রেনিং একাডেমিতে জয়েন করলেও ১৯৯১ সালে এক চুরির ঘটনায় তাকে বরখাস্ত করা হয় বলেও জানা যায়।

লাবলুর রহমানের পারিবারিক জীবন অত্যন্ত বিলাসবহুল এবং অর্থ ব্যয়ে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয় না। তার বড় মেয়ে মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করেন এবং প্রতি মাসে ২০-২৫ লক্ষ টাকা খরচ করেন, যা লাবলুর রহমান অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠিয়ে থাকেন। তার ছোট মেয়ে রাজধানীর উত্তরার ব্যায়বহুল এসটিএস স্কুলে পড়াশোনা করেন। যে স্কুলের মাসিক বেতন লক্ষাধিক টাকার উপরে।

তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত রা্জধানীর বিভিন্ন অভিজাত হোটেল ও ক্লাবে মদ্যপান ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং তারা প্রায়ই বিমান বাংলাদেশের বিজনেস ক্লাসে যাতায়াত করেন। লাবলুর রহমান নিজেও গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাবে অবস্থান করে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেন এবং তার বর্তমান স্ত্রীর সাথে (যাকে তিনি একবার ডিভোর্স দিলেও এখন বিয়ে না করে একসাথে থাকছেন)। তার অনৈতিক জীবনযাপনের চিত্র ফুটে উঠেছে।

এছাড়াও গুলশানে এক সুন্দরীর সঙ্গে লিভ টুগেদার করে থাকারও অবিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ফ্ল্যাট ও গাড়ি দিয় ওই নারীর কাছেও থাকার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি গুলশানের ওই মেয়ে যার বয়স ২৪-২৫ তার সন্তান সমতুল্য মেয়ে তাঁকে টাকা এবং ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে ভোগ করে থাকেন। বীভৎস রুচির মানসিকতা এই লোকটা বছরের পর বছর টাকা ও ক্ষমতার বলে মেয়েদের ব্যবহার করে যাচ্ছে এক কথায় তাঁকে রক্ষিতা বানিয়ে রাখছেন।

তিনি তার গার্লফ্রেন্ডকে এমন কোনো বিলাসিতা নেই যে তাকে দেননি,যাকে ধরে রাখতে মোবাইল ফোন এর মত প্রতি বছর তিনি নিউ নিউ গাড়ি গিফট করেন ।

2020-হ্যারিয়ার, 2021 মার্সিডিজ বেঞ্জ, 2023- লেক্সাস এসইউভি, 2025- সর্বশেষ টয়োটা স্কোয়ার গার্লফ্রেন্ডকে গিফট করে থাকেন।

প্রতিমাসে মিনিমাম ২৫/৩০ লাখ টাকার ডায়মন্ডের অর্নামেন্টস গিফট করেন তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য ডায়মন্ডের পায়েল বাংলাদেশের ২/৪ জন মেয়ের কাছে ও যা নাই ।

বর্তমানে বেবিচকের মেম্বার অ্যাডমিন হিসেবে লাবলুর রহমান দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে তিনি বর্তমানে রাজধানীর উত্তরায় ৪টি, বসুন্ধরায় ২টি, গুলশানে ১টি এবং বনানীতে ১টি সহ মোট ৮টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক এবং তার ব্যবহারের জন্য ৩টি দামী গাড়ি রয়েছে।

এদিকে দূর্নীতি বিরোধী সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখায়েরুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ঘটনা বিস্ময়কর। একজন সরকারী কর্মকর্তা কিভাবে এমন চুক্তি করতে পারেন।

তিনি প্রশ্ন করে বলেন, তার এত টাকার উৎসই বা কি? তার বিরুদ্ধে আর্থিক দূর্নীতির যে অভিযোগ দ্রুত তাকে তার পদ থেকে সরিয়ে সেটি তদন্ত করা প্রয়োজন।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে এস এম লাবলুর রহমানের এ ঘটনা পুরো বেবিচক জুড়েই আলোচনা হচ্ছে। একজন সরকারী কর্মকর্তা কিভাবে টাকার পাহাড় বানাতে পারেন তা সত্যিই বিস্ময়কর।

তারা বলেন, বিগত সরকারের আস্থাভাজন এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পূর্বে থেকে অভিযোগ ছিল। এ কারণে তাকে অপসারণের দাবিও উঠে। বর্তমানে যে ঘটনা ফাঁস হয়েছে তাতে করে সরকার তাকে দ্রুত অপসারণ করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিৎ।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ইতালিতে অবৈধভাবে লোক পাঠানোর অভিযোগে বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা গ্রেপ্তার

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন