নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় নীরবে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো থেকে গ্রামে ফেরা তরুণদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর পাশাপাশি ডেঙ্গুর স্পষ্ট উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও রোগীদের পরীক্ষা না করানোর প্রবণতা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সুনির্দিষ্ট আইসোলেশন ওয়ার্ডের অভাব- সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বর্ষা মৌসুমে তা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে মাত্র তিনজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। কিন্তু জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে নতুন করে আরও ১৮ জনের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১৩৪ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে পজিটিভ হয়েছেন ২১ জন।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, আক্রান্তদের বেশিরভাগই তরুণ। কর্মস্থল ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সম্প্রতি তারা ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে কেন্দুয়ায় ফিরেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু চিকিৎসায় কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য এখন পর্যন্ত পৃথক কোনো শয্যা বা সুনির্দিষ্ট আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ফলে সাধারণ ওয়ার্ডেই অন্যান্য সাধারণ রোগীদের সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ২৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে জটিলতা দেখা দিলে বা স্বজনরা চাইলে অনেক রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
খাতাপত্রের হিসাবের চেয়ে বাস্তবে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, জ্বর ও শরীর ব্যথার মতো ডেঙ্গুর স্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে অনেকেই হাসপাতালে আসছেন। তাদের একটি বড় অংশ ডেঙ্গু পরীক্ষা না করিয়ে বা হাসপাতালে ভর্তি না হয়েই বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। এই অসচেতনতার কারণে পুরো উপজেলায় ডেঙ্গুর প্রকৃত সংক্রমণ কতটা ছড়িয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নির্ণয় করা স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
সীমাবদ্ধতার মাঝেও রোগীদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন্দুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. নাঈম হাসান জানান, রোগীর জ্বর বা উপসর্গ শুরুর সময় বিবেচনা করে এনএস১ (NS1), আইজিএম (IgM), আইজিজি (IgG) ও সিবিসি (CBC) পরীক্ষা করা হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর প্লাটিলেট খুব দ্রুত কমতে শুরু করে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।”
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সচেতন করতে ইতোমধ্যে একজন সিনিয়র স্টাফ নার্সের মাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, “সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। বাড়ির আশপাশে ফুলের টব, পুরোনো বোতল, কৌটা, ডাবের খোসা বা অন্য কোনো পাত্রে যেন বৃষ্টির পানি জমে থাকতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।”
পড়ুন : বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট: কতটুকু দায় বিএনপি সরকারের? কতটুকু অন্যদের?


