দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের যে বড় বোঝা তৈরি হয়েছে, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ঘাড়ে। ব্যাংক ছয়টিতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এই খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, মূলধন পরিস্থিতি ও সামগ্রিক সুশাসন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি উত্তরণে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংককে নগদ ঋণ আদায় বাড়ানো, ঋণের গুণগত মান যাচাই, আমানত বৃদ্ধি এবং মূলধন পরিস্থিতির উন্নতি করার নির্দেশ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এরপর অগ্রণী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ রয়েছে ২৯ হাজার ২৯ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকে ১৯ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকে ১৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকে ৮ হাজার ১৩১ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে প্রায় ৮৮৯ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে।
বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে এসব ব্যাংকের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। ঋণের বিপরীতে বড় অঙ্কের প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন হওয়ায় কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতিতেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং ঋণ আদায়ের কার্যক্রম জোরদার করাকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানো ও ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতির জন্য ১২ থেকে ২৪ মাসের একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনায় ঋণ আদায়, আমানত বৃদ্ধি, মূলধন পরিস্থিতির উন্নতি এবং ব্যাংকের সার্বিক পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তবে বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে নগদ অর্থ আদায় এবং তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তালিকা তৈরি বা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলেই খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধান হবে না। এর পাশাপাশি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করা, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়ানো এবং ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, সমস্যাটি সমাধানে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। তার মতে, সরকার যদি ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারের বিষয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তাহলে কয়েক মাস থেকে এক বছরের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোকে এই সংকট থেকে বের করে আনতে হলে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তার ভাষায়, ব্যাংক ঘুরিয়ে দিতে হলে এবং বর্তমান সংকট থেকে মুক্ত করতে হলে সরকারের দৃঢ় অবস্থান ও সদিচ্ছা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, এই সদিচ্ছার ঘাটতিই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ের বিষয়ে ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী নগদ আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, নগদ অর্থ আদায় করা কঠিন হলেও ঋণ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। অন্যদিকে জামানত বিক্রি করে ঋণ আদায়ের উদ্যোগ নিলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। জামানত বিক্রির ক্ষেত্রে মামলা-মোকদ্দমাসহ দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে হতে পারে, যা ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
এদিকে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে বড় অঙ্কের প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজনে এসব ব্যাংককে সরকার মূলধন সহায়তা দিতে পারে বলে জানা গেছে। তবে এর সঙ্গে শর্তও থাকবে। ঋণ আদায় বাড়িয়ে নিজেদের ঘাটতি পূরণ এবং ধীরে ধীরে লাভজনক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সক্ষমতা দেখাতে হবে ব্যাংকগুলোকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলধন সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অতীতে যেসব ঋণ অনাদায়ী হয়েছে, সেগুলোর কারণ খুঁজে বের করা এবং ঋণ অনুমোদন ও বিতরণে অনিয়ম থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে সরকারি অর্থ দিয়ে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নাও হতে পারে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আধুনিক ও সহজলভ্য ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রাহকদের ব্যাংকমুখী করা সম্ভব। নতুন নতুন ব্যাংকিং সেবা চালু করা, অনলাইন ও মোবাইলভিত্তিক লেনদেন সহজ করা এবং গ্রাহকসেবার মান উন্নত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো আমানত বাড়াতে পারে।
পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থ দেশে আনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক ও সহজ সেবা নিশ্চিত করতে পারলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে, বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে আর্থিক চাপের মুখে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংককে ঘুরে দাঁড়াতে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। শীর্ষ ঋণখেলাপিদের তালিকা তৈরি, ১২ থেকে ২৪ মাসের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, নগদ আদায় বাড়ানো, আমানত বৃদ্ধি, মূলধন পরিস্থিতির উন্নতি এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এখন এসব নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থার উন্নতি।
পড়ুন:ডিজিটাল ব্যাংক: মানুষের উপকারে আসবে কতটুুকু?
ইমি/


