চোখে ছিল বিসিএস ক্যাডার হয়ে পরিবারের হাল ধরার রঙিন স্বপ্ন। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই চোখ আজ দৃষ্টিহীন। মরণব্যাধি ব্রেইন টিউমার শুধু তার চোখের আলোই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে একটি দরিদ্র পরিবারের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও। বলছিলাম নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কান্দিউড়া ইউনিয়নের পারলা গ্রামের তরুণ রাকিব রায়হানের কথা। অর্থাভাবে আজ তার চিকিৎসা পুরোপুরি বন্ধ। অথচ চিকিৎসকরা বলছেন, উন্নত চিকিৎসা পেলে এই তরুণ আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।
দুলাল মিয়ার (৫০) চার সন্তানের মধ্যে সবার বড় রাকিব। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হলেও মেধার কোনো কমতি ছিল না তার। ২০১৭ সালে সাজিউড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর থেকেই তার চোখে ছিল আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। ইচ্ছে ছিল বিসিএস দিয়ে ভালো চাকরি করে পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচাবেন। কিন্তু ২০২২ সালে হঠাৎই সেই স্বপ্নে ছেদ পড়ে। ধরা পড়ে ব্রেইন টিউমার। সহায়-সম্বল যা ছিল, তা দিয়ে দু-দুটি ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচার করানো হয়। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও, ২০২৬ সালে এসে আবারও থাবা বসায় ঘাতক ব্যাধি। টিউমারটি বর্তমানে ক্যান্সারের রূপ নিতে চলেছে বলে জানিয়েছে তার পরিবার। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতির পাশাপাশি চিরতরে নিভে গেছে তার চোখের আলো।
রাকিবের বাঁচার আকুতি হার মানিয়েছে চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণাকেও। পরিবারের সদস্যরা জানান, ঢাকার পিজি হাসপাতালের এক চিকিৎসক একসময় আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। রাকিবকে বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ছেলেটির আয়ু আর মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে এবং বাঁচার প্রবল ইচ্ছাশক্তিতে সেই নির্দিষ্ট সময়ের পর আরও ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও রাকিব আজও বেঁচে আছেন, লড়ে যাচ্ছেন মৃত্যুর সঙ্গে।
এই লড়াইয়ে নতুন আশার আলো দেখিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসক। তিনি জানিয়েছেন, আরেকটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করতে পারলে রাকিবের সুস্থ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শেষ সুযোগটি কাজে লাগাতে প্রয়োজন আনুমানিক ১০ লাখ টাকা।
জীবন বাঁচানোর ১০ লাখ টাকা জোগাড় করা রাকিবের পরিবারের জন্য এখন আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব। ছেলের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় ১৮ লাখ টাকা খরচ করেছেন বাবা দুলাল মিয়া। এর মধ্যে ১৫ লাখ টাকাই বিভিন্ন জায়গা থেকে নেওয়া ঋণ। ছেলের জীবন বাঁচাতে সহায়-সম্বল যা ছিল, সবই বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। পাওনাদারদের চাপে এখন দিশেহারা পুরো পরিবার।
রাকিবের ছোট ভাই রনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, বড় ভাইয়ের চিকিৎসার টাকা জোগাতে গিয়ে তার নিজের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গেছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে কিছুদিন আগে। ঋণের টাকা শোধ করতে না পারায় পাওনাদাররা তাদের চোখের সামনেই বাবা দুলাল মিয়াকে নির্মমভাবে মারধর করে। ছেলের জীবন বাঁচানোর আকুতি আর পাওনাদারদের অপমান- সব মিলিয়ে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন পার করছে পরিবারটি।
যে ছেলেটি একদিন সমাজের আলো হতে চেয়েছিল, সে আজ নিজেই অন্ধকারের বাসিন্দা। টাকার অভাবে তার চিকিৎসা এখন পুরোপুরি বন্ধ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় সমাজের হৃদয়বান মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। পরিবারটি এখন দেশবাসী, প্রবাসী, বিত্তবান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে।
স্থানীয় সমাজকর্মী মাখন অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, “রাকিব ছেলেটা অসম্ভব মেধাবী আর স্বপ্নবাজ ছিল। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষগুলো যদি একটু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগিয়ে আসেন, তবেই রাকিবের জরুরি অস্ত্রোপচার সম্ভব। আমাদের সবার একটু একটু সহযোগিতাই পারে একটি সম্ভাবনাময় জীবনকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনতে।”
রাকিবের বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর তার পরিবারের নীরব কান্না হয়তো কোনো এক সহৃদয় মানুষের অপেক্ষায়। ১০ লাখ টাকা একজন ব্যক্তির জন্য অনেক বড় অংক হতে পারে, সমাজের বিত্তবানরা একটু একটু করে হাত বাড়ালে রাকিব ফিরে পেতে পারে তার হারানো পৃথিবী, আর দুলাল মিয়া ফিরে পেতে পারেন তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
পড়ুন:রূপগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আবু মাসুমের নিজ অর্থায়নে রাস্তা মেরামত ও নির্মাণ অব্যাহত
ইমি/


